পবিত্র মক্কা নগরী লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ড্রোন হামলা চালানোর অপচেষ্টা করেছে বলে সরাসরি অভিযোগ তুলেছে সৌদি আরব। সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের আগেই মক্কার দক্ষিণে ড্রোনটি ভূপাতিত করে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ রিয়াদ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইসলামের পবিত্র স্থানের ওপর এমন আক্রমণ চূড়ান্ত সীমার লঙ্ঘন এবং এর সমুচিত জবাব দেওয়া হবে। তবে হুতিরা সৌদির এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছে। হুতিদের দাবি, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতেই সৌদি আরব এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। উল্টো তারা সৌদি আরবের এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা এবং আরামকো তেল শোধনাগারে হামলার দাবি করেছে।
মক্কা লক্ষ্য করে ড্রোন ছোঁড়ার খবরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে ঢাকা জানায়, বাংলাদেশ মক্কার পবিত্রতা ও সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পুনর্ব্যক্ত করছে এবং সৌদি জনগণের পাশে রয়েছে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে ৫৭টি মুসলিম দেশের জোট ওআইসি, আরব লীগ, কুয়েত, জর্ডান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও ভারত। আরব লীগের মহাসচিব নাবিল ফাহমি বলেন, ইসলামের পবিত্রতম স্থানের ক্ষতি করার অপচেষ্টা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। এদিকে হামলার আশঙ্কায় মক্কার পাশাপাশি জেদ্দা ও তায়েফে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় তা প্রত্যাহার করা হয়।
মাঠের লড়াইয়ে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, মারিব এলাকায় ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তারা সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। মারিবের হেলান পর্বতের কাছে এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া হুতিরা দাবি করেছে, গত কয়েক দিনে সৌদি জোট তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে অন্তত ৪৫০টি বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হামলার কথা স্বীকার করলেও রিয়াদ প্রকাশ্যে বিমান ভূপাতিত হওয়ার বিষয়ে মুখ খোলেনি। নতুন এই পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।
যুদ্ধের এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ওমানের রাজধানী মাসকাটে হুতিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করেছে রয়টার্স। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওমানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে হুতিরা জানায়, তারা মার্কিন বাণিজ্য জাহাজে আক্রমণ করবে না এবং আগের যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে। তবে তারা স্পষ্ট করেছে, কেবল ইসরায়েল ও সৌদির মালিকানাধীন জাহাজে তাদের লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ অব্যাহত থাকবে। লোহিত সাগরে নিজেদের আধিপত্য অটুট রেখেই হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অত্যন্ত কৌশলে এই গোপন কূটনৈতিক বোঝাপড়া বজায় রেখেছে।
কৌশলগতভাবে হুতিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের মাইয়ুন দ্বীপ ও মোখা শহর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এতে বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রায় ১০০% নিশ্চিত হয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি প্রায় ২৫% কমে গেছে। প্রতিদিন কোটি কোটি $ ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে সৌদি তেল কোম্পানিগুলো। পণ্যবাহী জাহাজগুলো আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জাহাজ ভাড়া বহুগুণ বেড়েছে, যার বড় মাশুল দিতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধক্ষেত্রে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের সংঘাত দিন দিন রক্তক্ষয়ী রূপ নিচ্ছে। মারিব ও তায়েজ প্রদেশে দুই পক্ষই ভারি অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হয়েছে। সরকারি বাহিনী হুতিদের অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়ার দাবি করলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, নতুন লড়াই শুরুর পর ১ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এছাড়া প্রাণ বাঁচাতে ২,০০০ জনের বেশি মানুষ লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে পূর্ব আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক লরেঞ্জো কামেল আল-জাজিরাকে জানান, হুতিদের নিছক ইরানের পুতুল ভাবলে তাদের শক্তি সঠিকভাবে অনুধাবন করা যাবে না। তারা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আধিপত্য পাকাপোক্ত করতে এবং সৌদি আরবকে চাপে ফেলতেই এ কৌশল নিয়েছে। মক্কাকে জড়িয়ে এই বিতর্ক ও লোহিত সাগরের সামরিক অচলাবস্থা দ্রুত বন্ধ না হলে তা বিশ্বজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
















