হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে বারবার নৌদুর্ঘটনা: পদ্মার তীব্র ঘূর্ণিস্রোত নাকি চরম অবহেলা?

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও সংলগ্ন লালন শাহ সেতুর নিচে পদ্মা নদী এখন যেন এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এখানে নৌযান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া কিংবা যাত্রী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা প্রায় নিয়মিত চিত্রে রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকা থেকে পিকনিক শেষে নৌকায় ফেরার পথে শৈলকূপা পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব রাকিবুজ্জামান রকিসহ তিনজন নদীতে পড়ে যান। দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০ মাইল ভাটিতে ভেসে ওঠে রকির নিথর দেহ। এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের চোখের সামনে কেন বারবার একই জায়গায় ট্রলার ও নৌকার এমন মর্মান্তিক সলিল সমাধি ঘটছে?

নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পিলারে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনা ঘটার নজির এটিই প্রথম নয়। এর আগেও ২০২১ সালের ১৩ জুলাই তীব্র স্রোতের মুখে ডিঙি নৌকা ডুবে রায়হান প্রামাণিক নামের এক যুবক নিখোঁজ হন এবং দীর্ঘ ৭ দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া চলতি বছরের ২৯ মে বন্ধুদের সঙ্গে নৌভ্রমণে এসে হঠাৎ দমকা বাতাসে নৌকা থেকে পড়ে প্রাণ হারান রিফাত হাসান রক্তিম নামের আরেক তরুণ। এমনকি গত ১৬ আগস্ট ব্রিজের নিচে বালুবোঝাই একটি ভারী ট্রলার ডুবে যায়, যেখানে চালকসহ ৫ জন অলৌকিকভাবে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন। এর বাইরেও অসংখ্য ছোটখাটো সংঘর্ষ ও নৌকাডুবির ঘটনা ঘটছে, যা প্রাণহানি না ঘটায় গণমাধ্যমের নজরে আসে না।

কিন্তু কেন এই নির্দিষ্ট এলাকাটি এতটা ঝুঁকিপূর্ণ? নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের তীব্র জলপ্রবাহ এর অন্যতম প্রধান কারণ। বর্ষার শেষভাগে উজান থেকে বিপুল পরিমাণ ঢল নেমে আসায় পদ্মার পানির উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি স্রোতের তীব্রতা প্রায় ৫০% থেকে ৬০% বৃদ্ধি পায়। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে থাকা ১৬টি বিশালাকার পুরনো পিয়ার এবং পাশেই লালন শাহ সেতুর ভারী খুঁটিগুলোর কারণে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হয়। সরু পথ দিয়ে তীব্র বেগে পানি নামার সময় ব্রিজের নিচে তৈরি হয় মারাত্মক ঘূর্ণিপাক ও বিপরীতমুখী চোরাস্রোত। অনভিজ্ঞ চালকদের পক্ষে এই উত্তাল ঢেউ আর ঘূর্ণির মধ্যে নৌযানের নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তবে কেবল নদীর প্রাকৃতিক স্রোতকে দায়ী করে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। সরেজমিনে দেখা যায়, এই রুটে চলাচলকারী প্রায় ৯০% ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে কোনো ধরনের লাইফ জ্যাকেট বা বয়া থাকে না। বাজারে মাত্র ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা মূল্যের একটি সাধারণ লাইফ জ্যাকেট থাকলে হয়তো অনেক মূল্যবান প্রাণ বেঁচে যেত, যা আন্তর্জাতিক মূল্যে মাত্র $১০ থেকে $১২ ডলারের সমপরিমাণ। দূর-দূরান্ত থেকে আনন্দভ্রমণে আসা সাধারণ পর্যটকরা নদীর এই গোপন মরণফাঁদ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। অতিরিক্ত ভাড়া কামানোর লোভে নৌকার মাঝিরাও যাত্রীদের কোনো ধরনের নিরাপত্তা সামগ্রী না পরিয়েই সরাসরি বিপজ্জনক পিলারের কোল ঘেঁষে ঝুঁকি নিয়ে নৌযান চালান।

দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধারের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঘাটতি স্পষ্ট। পানিতে কেউ পড়ে গেলে প্রথম ১০ থেকে ১৫ মিনিট হচ্ছে জীবন রক্ষার ‘গোল্ডেন টাইম’। অথচ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় সার্বক্ষণিক কোনো ডুবুরি দল বা জরুরি উদ্ধারকারী স্পিডবোট মোতায়েন থাকে না। ফায়ার সার্ভিস বা নৌপুলিশ খবর পেয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে স্রোতের তোড়ে মানুষ বহু মাইল দূরে ভেসে যায়। রকিসহ অতীতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে এই উদ্ধার তৎপরতার ধীরগতি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। পর্যাপ্ত উদ্ধার সক্ষমতা না থাকায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীর পাড়ে লাশের অপেক্ষায় বুক চাপড়াতে হয়।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু এলাকা কুষ্টিয়া ও পাবনার অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষ এখানে পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করেন। কিন্তু একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। নিরাপত্তা জোরদার না হলে এই অঞ্চলে নৌ-পর্যটকদের সংখ্যা আগামীতে অন্তত ২৫% থেকে ৩০% হ্রাস পাওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও নৌযান শ্রমিকরা বলছেন, প্রশাসন যদি ঘাটগুলোতে নিয়মিত তদারকি চালাত এবং ফিটনেসবিহীন নৌকার বিরুদ্ধে জরিমানা করত, তবে মাঝিরা এভাবে বেপরোয়াভাবে মানুষ বোঝাই করার সাহস পেত না।

পদ্মার এই বধ্যভূমিতে আর কোনো অমূল্য প্রাণের অবসান দেখতে চায় না কেউ। তাই অবিলম্বে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১৬টি পিয়ারের আশপাশের বিপজ্জনক এলাকাগুলোকে লাল বয়া ফেলে ‘ঝুঁকিপূর্ণ জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। ব্রিজের নিচ দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করার পাশাপাশি শতভাগ (১০০%) যাত্রীর লাইফ জ্যাকেট পরিধান বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ঘাটগুলোতে সার্বক্ষণিক উদ্ধারকারী দল এবং নৌপুলিশের নিয়মিত টহল নিশ্চিত করতে না পারলে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ