চুয়াডাঙ্গায় ৫৩তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন: দিনভর ডিসির বহুমুখী কর্মসূচি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে চুয়াডাঙ্গায় শুরু হয়েছে ৫৩তম জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা-২০২৬। সোমবার সকালে চুয়াডাঙ্গা পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে এই ক্রীড়া আসরের আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন নাহার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজ ও সুশৃঙ্খল শারীরিক কসরত পুরো স্টেডিয়াম চত্বরে এক দারুণ উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করে।

উদ্বোধনী বক্তব্যে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, নিয়মিত খেলাধুলা তরুণ প্রজন্মের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক বিকাশে টনিক হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির অতি ব্যবহারে প্রায় ৫০% থেকে ৬০% শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনের ক্ষতিকর আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে। খেলাধুলার মাঠই পারে কিশোর-কিশোরীদের এই স্ক্রিন আসক্তি ও মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে। তিনি ক্রীড়াবিদদের উদ্দেশে বলেন, খেলায় হার-জিতের চেয়ে নিয়মানুবর্তিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এবারের গ্রীষ্মকালীন প্রতিযোগিতায় ফুটবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি ও সাঁতারের মতো বিভিন্ন ইভেন্টে প্রায় ৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধনের পর জেলা প্রশাসক সদর উপজেলার আকুন্দবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছুটে যান। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিশুদের মধ্যে উত্তম মানবিক গুণাবলি বিকাশের লক্ষ্যে শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক সভায় অংশ নেন তিনি। সভায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার শতভাগ (১০০%) নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়। এছাড়া শিশুদের ওপর পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে তাদের সহমর্মিতা ও সৃজনশীলতার শিক্ষা দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেন জেলা প্রশাসক।

উক্ত মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক নিজ হাতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আকর্ষণীয় পুরস্কার ও বই উপহার দেন। নিয়মিত ক্লাসে আসা, শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার রাখা এবং সহপাঠীদের বিপদে এগিয়ে আসার মতো সুন্দর অভ্যাসের জন্য শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করা হয়। এ সময় তিনি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রতিদিনের টিফিনের খরচ থেকে অন্তত ১০ বা ২০ টাকা বাঁচিয়ে মাটির ব্যাংকে জমা করার অভ্যাস গড়ে তুললে তা ভবিষ্যতে বড় সঞ্চয়ে রূপ নেবে।

এরপর দুপুরে আলুকদিয়া ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছান জেলা প্রশাসক। সেখানে প্রান্তিক নারীদের আইনি সুরক্ষা ও সহযোগিতা সহজ করতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নারী কল্যাণ সাপোর্ট সেল’-এর শুভ উদ্বোধন করেন তিনি। এই সেলের মাধ্যমে গ্রামের অসচ্ছল ও নির্যাতিত নারীরা কোনো ঝামেলা ছাড়াই সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং দ্রুত সেবা পাবেন। স্থানীয়ভাবে এমন সেবা চালু হওয়ায় গ্রামের দরিদ্র নারীদের সামান্য বিষয়ের জন্য জেলা শহরে গিয়ে যাতায়াত বাবদ $৫০ থেকে $১০০ ডলার বা হাজার হাজার টাকা ব্যয়ের ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে।

আলুকদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০% নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ঘরে রেখে বা তাদের ওপর নির্যাতন চলতে দিয়ে সমাজের টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। নবগঠিত সাপোর্ট সেলের তৎপরতায় পারিবারীক বিরোধ, যৌতুক ও বাল্যবিয়েসংক্রান্ত সমস্যার প্রায় ৮০% ইউনিয়ন পর্যায়েই সুষ্ঠুভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এই কাজে শতভাগ সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

ক্রীড়াঙ্গন থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদ—জেলা প্রশাসকের দিনব্যাপী এমন ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। উপস্থিত শিক্ষক, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, মাঠ প্রশাসনে এমন সরাসরি তদারকি অব্যাহত থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ