মেহেরপুরে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন স্বপ্ন: গাংনীতে ৬০ অসহায় নারীকে সেলাই মেশিন দিল জেলা পরিষদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মেহেরপুর প্রতিনিধি: গ্রামীণ প্রান্তিক নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে এবং অসচ্ছল পরিবারগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে এক মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে মেহেরপুর জেলা পরিষদ। এই উদ্যোগের আওতায় গাংনী উপজেলার ৬০টি অসহায় ও হতদরিদ্র পরিবারের নারীদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিনামূল্যে নতুন সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়েছে। সোমবার সকালে গাংনী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘সেলাই মেশিন বিতরণ-২০২৬’ শীর্ষক এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে উপকারভোগীদের হাতে এসব মেশিন তুলে দেন অতিথিরা। মূলত পারিবারিক সচ্ছলতা ফেরানো এবং নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতেই এই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা পরিষদ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মেহেরপুর জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ. এম. সালাউদ্দীন মনজু। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক জনসংখ্যার প্রায় ৫০% নারী। এই বিশাল নারীসমাজকে পিছিয়ে রেখে কোনো পরিবার বা সমাজ অর্থনৈতিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তিনি আরও বলেন, একটি সেলাই মেশিন কেবল কোনো সাধারণ সামগ্রী নয়, এটি একজন অসচ্ছল নারীর কাছে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় হাতিয়ার। সঠিক পরিশ্রম ও কাজের প্রতি মনোযোগ থাকলে এই একটি মেশিন কাজে লাগিয়ে প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে অন্তত ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা বাড়তি আয় করতে পারবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাবিদ হোসেন। তিনি উপকারভোগী নারীদের উদ্দেশে বলেন, সরকারি এই অনুদান যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। বর্তমান খোলা বাজারে একটি টেকসই সেলাই মেশিনের দাম প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা বা আন্তর্জাতিক মূল্যে প্রায় $৮০ থেকে $৯০ ডলারের কাছাকাছি। অসচ্ছল পরিবারের পক্ষে এককালীন এত টাকা জোগাড় করে মেশিন কেনা প্রায় অসম্ভব। তাই জেলা পরিষদের দেওয়া এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নারীদের নিজেদের দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এতে করে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামীণ নারীদের বেকারত্ব অন্তত ১৫% থেকে ২০% কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সেলাই মেশিন হাতে পেয়ে উপকারভোগী নারীদের চোখে-মুখে ছিল আনন্দের স্পষ্ট ছাপ। তাদেরই একজন ষাটোর্ধ্ব রহিমা খাতুন জানান, সংসারে দিনমজুর স্বামীর একার আয়ে সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন সমিতি বা এনজিও থেকে ঋণ নিতে গেলে শতকরা প্রায় ২৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত বাড়তি সুদ দিতে হয়। এখন তিনি ঘরে বসেই প্রতিবেশীদের জামা-কাপড় সেলাই করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন এবং ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারবেন। উপস্থিত অন্যান্য নারীরাও জেলা পরিষদের এমন জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

জেলা পরিষদের প্রধান সহকারী জাহিদুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তা হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন গাংনী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা রোকনউদ্দিন। তিনি জানান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর নারীদের জন্য নিয়মিত আধুনিক সেলাই ও নকশিকাঁথা তৈরির বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সেলাই মেশিন পাওয়া এই নারীরা যেন তাদের কাজের মান বাড়াতে পারেন, সেজন্য যুব উন্নয়ন বিভাগ সব ধরনের কারিগরি পরামর্শ দেবে। এর ফলে তাদের তৈরি পোশাকের চাহিদা স্থানীয় বাজারে আরও বাড়বে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গাংনী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি রেজাউল হক, উপজেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি আলফাস উদ্দিন কালু এবং গাংনী পৌরসভা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমান। এছাড়া জেলা পরিষদের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সমাজকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং উপকারভোগী পরিবারের সদস্যরা এই আয়োজনে যোগ দেন। নেতৃবৃন্দ জেলা পরিষদের এমন উন্নয়নমূলক কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে এর পরিধি আরও বাড়ানোর তাগিদ দেন।

জেলা পরিষদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে মেহেরপুর সদর, গাংনী এবং মুজিবনগর উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে ধাপে ধাপে আরও প্রায় ৫০০টি দুস্থ পরিবারের মাঝে এ ধরনের ক্ষুদ্র কর্মসংস্থান সামগ্রী বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা আশা করছেন, নিয়মিত তদারকি থাকলে এই ৬০ জন নারী খুব দ্রুতই সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠবেন এবং আশপাশের অন্যান্য অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রেরণা জোগাবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ