ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দর মোখার পতন: হুতি ও সরকারি বাহিনীর ভয়াবহ লড়াইয়ে ঝুঁকিতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরনগরী হুতিদের দখলে চলে যাওয়ার পর ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ শহরের কাছে কাধা এলাকায় দুই পক্ষ এখন মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত। মোখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শহর হাতছাড়া হওয়ায় সরকারি বাহিনী বড় ধাক্কা খেয়েছে। হুতি যোদ্ধারা এখন দেশটির অন্যতম প্রধান জ্বালানি সমৃদ্ধ অঞ্চল মারিবের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। সেখানেও সরকারি প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে তাদের তুমুল গোলাগুলি ও রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। মারিব শহরটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে গেলে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে সরকারি পক্ষের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভেঙে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মারিব শহর শুধু সামরিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি পুরো ইয়েমেনের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দেশটির সিংহভাগ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের কেন্দ্রগুলো এই মারিবে অবস্থিত। এখান থেকেই সরকারের সিংহভাগ রাজস্ব আসে। ফলে এই অঞ্চলটি যে পক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক ক্ষমতাও তাদের হাতে চলে যাবে। রাজধানী সানার দিক থেকে হুতিরা আল-মাশজাহ ও আল-জোর এলাকায় বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে। তবে সরকারি সেনারা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলে তাদের কিছু অগ্রযাত্রা আটকে দিয়েছে বলে দাবি করেছে। এই লড়াইয়ে সরকারি বাহিনীকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত বিমান সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

ভয়াবহ এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া নতুন এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। সংঘাতের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, চলতি সপ্তাহেই ২ হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স স্বীকার করেছে, গত এক মাসে হুতিদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে তাদের ৫০০ জনের বেশি সেনা নিহত এবং প্রায় ১,৫০০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

যুদ্ধক্ষেত্র কেবল ইয়েমেনের সীমানায় আটকে নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী সৌদি আরবেও। হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও শক্তিশালী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অস্ত্রের গুদাম ও কমান্ড সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে হুতিরা দাবি করেছে। ক্রমাগত ড্রোন হামলার জেরে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। লোহিত সাগর তীরের ইয়ানবু বন্দরে বর্তমানে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের চাহিদা মেটানোর মতো তেল মজুত রয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক মোট জ্বালানি জোগানের প্রায় ৪%। এই সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি $90 ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হুতিদের অগ্রযাত্রা থামাতে সৌদি আরবও তাদের বিমান হামলা ব্যাপকভাবে জোরদার করেছে। সশস্ত্র হুতি গোষ্ঠী জানিয়েছে, সৌদি জোট তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ওই হামলায় এক ইরানি নাবিক নিহত এবং চারজন আহত হন। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে ওমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। তবে বাহরাইন এই বৈঠকে যোগ না দেওয়ার কথা জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, ওমানের এই বৈঠক নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই, এটি সম্পূর্ণ ওই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব বিষয়।

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারপন্থী জোটের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ও সমন্বয়হীনতার কারণেই হুতিরা ময়দানে দ্রুত সুবিধা পাচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা শান্ত থাকলেও সাম্প্রতিক এই সংঘাত পুরো অঞ্চলে নতুন করে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক লোহিত সাগর বাণিজ্য পথ ও জ্বালানি তেল সরবরাহের ওপর এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বনেতারা সংঘাত অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানালেও মাঠের পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্য আরেক দফায় দীর্ঘমেয়াদী ও বিধ্বংসী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ