চামড়ার বেল্ট দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে স্ত্রীকে পেটাচ্ছেন স্বামী, আর পাশের ঘরে ভয়ে কাঁদছে দুটি অবোধ শিশু। আকুতি জানিয়েও মার থামেনি, উল্টো মৃত্যুর পর গৃহবধূ মুক্তা ইসলামের সেই ভয়াবহ নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আরেক তরুণী আল মাইদা আক্তারকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে। মৃত্যুর ঠিক দুই দিন আগেও মুখে আঘাতের ব্যান্ডেজ পরা ছবি খালাতো বোনকে পাঠিয়ে মাইদা লিখেছিলেন, “আপা, ও আমাকে আজও মেরেছে।” এই দুটি ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের অসংখ্য নারীর প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতার করুণ প্রতিচ্ছবি।
বিশ বছর বয়সী মাইদা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। চার বছর ও এক বছর বয়সী দুটি ফুটফুটে ছেলেসন্তান রেখে গেছেন তিনি। বাবা মারা যাওয়ার পর মা অনেক কষ্টে মাইদা ও তাঁর ভাইকে বড় করেছিলেন। ভালোবেসে বিয়ে করলেও স্বামীর প্রতিদিনের নির্যাতন সয়ে মাইদা সংসার করছিলেন কেবল সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। স্বজনরা বারবার সংসার ছেড়ে চলে আসতে বললেও মাইদা বলতেন, সন্তানেরা ছোট, চলে এলে ওরা কষ্ট পাবে। অথচ সেই স্বামী শেষ পর্যন্ত মাইদাকে পিটিয়ে হত্যা করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেন বলে পরিবারের অভিযোগ। এখন মায়ের বুকের দুধ না পেয়ে মাইদার এক বছরের শিশুটি রাত-দিন অঝোরে কাঁদছে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঘরের ভেতরে নারীরা কতটা অনিরাপদ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নারী নির্যাতনের অভিযোগে মোট ২৭,৯১১টি ফোন কল এসেছে। এর মধ্যে শুধু স্বামীর বিরুদ্ধেই নির্যাতনের অভিযোগ এসেছে ১৭,১৯৬টি, যা মোট কলের প্রায় ৬২%। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০ জন নারী স্বামীর নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে বাঁচার জন্য পুলিশের সহযোগিতা চেয়ে ফোন করেছেন। গত বছর পুরো সময়ে এই অভিযোগের হার ছিল প্রায় ৫৮%। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান কেবল বাস্তবতার সামান্য অংশ; কারণ দেশের অধিকাংশ নির্যাতিত নারী লোকলজ্জা আর সামাজিক চাপের ভয়ে কোনো অভিযোগই করেন না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০% নারী জীবনে অন্তত একবার হলেও স্বামী বা সঙ্গীর হাতে কোনো না কোনো সহিংসতার শিকার হয়েছেন। জরিপের আগের ১২ মাসেই প্রায় ৪১% নারী সরাসরি শারীরিক, মানসিক বা আর্থিক নির্যাতনের মুখে পড়েছেন। এর আগের জরিপগুলোতে এই হার ছিল যথাক্রমে ৭৩% ও ৮০%। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণা মতে, নারীর প্রতি এমন সহিংসতার কারণে চিকিৎসা ব্যয় ও কর্মক্ষমতা কমে গিয়ে বছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় $১.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পরোক্ষ ক্ষতি হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এর মধ্যে স্বামীর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ১০৮ জন নারী। সমাজ এখনও পারিবারিক সহিংসতাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে “স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাপার” বলে ধামাচাপা দিতে চায়। পরিবারগুলোও মেয়েদের শিখিয়ে দেয় মুখ বুজে সব সহ্য করতে। অপরদিকে আদালত পর্যন্ত যেসব মামলা পৌঁছায়, সেগুলোর বিচার হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসে এবং তাদের অপরাধ করার সাহস ক্রমাগত বাড়তেই থাকে।
আইন থাকা সত্ত্বেও বিচার না হওয়া এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াই এই মৃত্যুর মিছিলের প্রধান কারণ। অধিকারকর্মীরা স্পষ্ট বলছেন, সমাজে নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে এবং পারিবারিক নির্যাতনকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখতে হবে। মাইদার মা সন্তানের ছবি বুকে চেপে আজও কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেয়ে হত্যার ফাঁসি দাবি করছেন। প্রতিটি ঘরে নারীর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নিয়ে দ্রুত রায় কার্যকর করতে হবে। তা না হলে মুক্তা বা মাইদার মতো বহু নারীকে সংসারের মায়া আর সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে নির্মমভাবে জীবন দিতে হবে।
















