মেয়ের বাড়িতে গিয়ে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে আনন্দ করে সময় কাটাবেন এমন স্বপ্ন নিয়েই রোববার সকালে হাসিমুখে নিজের বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা হাওয়া বেগম। কিন্তু পথিমধ্যেই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলুকদিয়া বাজারে রাস্তা পার হতে গিয়ে একটি দ্রুতগতির পিকআপ ভ্যানের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। সকালে চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। পিকআপের সজোরে দেওয়া ধাক্কায় রাস্তায় ছিটকে পড়ে তিনি গুরুতর জখম হন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
নিহত হাওয়া বেগম চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার মদনা গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদের স্ত্রী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালবেলা আলুকদিয়া বাজার এলাকায় সাধারণ মানুষের বেশ ভিড় ছিল। হাওয়া বেগম সাবধানে একপাশ থেকে অন্যপাশে যাওয়ার জন্য রাস্তা পার হচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময়েই চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা দ্রুতগতির একটি পিকআপ ভ্যান তীব্র বেগে ছুটে আসে। চালক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পেরে সোজাসুজি বৃদ্ধাকে আঘাত করে। উপস্থিত লোকজন দ্রুত তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও আঘাত এতই তীব্র ছিল যে কোনো সুযোগ পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার পরপরই ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা ধাওয়া করে পিকআপসহ চালককে ধরে ফেলেন। আটক চালকের নাম মোহাম্মদ শুকুর আলী (৩২), তিনি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। স্থানীয়রা আইন নিজের হাতে না তুলে চালককে সরাসরি পুলিশে সোপর্দ করেন।
হাওয়া বেগমের এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবর মদনা গ্রাম ও মেয়ের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের কান্নায় চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি চুয়াডাঙ্গায় মেয়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য পরিকল্পনা করছিলেন। সকালে তিনি নিজে গুছিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু কয়েক কিলোমিটার পার হতেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। যে মা সকালে নিজের পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছিলেন, দুপুরে তাকে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে লাশবাহী গাড়িতে। এই শোক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার সন্তানেরা।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ পিকআপ ভ্যানটি জব্দ করেছে এবং চালক শুকুর আলীকে বর্তমানে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের কোনো ধরনের গাফিলতি ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
আলুকদিয়া বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর আঞ্চলিক সড়কে চালকরা কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সড়কে চলাচলকারী প্রায় ৬০% যানবাহন নির্ধারিত গতিসীমা অমান্য করে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে চলে। অথচ বাজার এলাকায় সর্বোচ্চ গতি থাকার কথা ছিল ৩০ কিলোমিটার। বাজারে কোনো স্পিডব্রেকার বা জেব্রা ক্রসিং না থাকায় পথচারীদের সবসময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয়। গত ৩ মাসে এই একই এলাকায় অন্তত ৮টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হয়েছেন।
বর্তমানে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারী মৃত্যুর ঘটনা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ২৫% থেকে ৩০% ঘটনায় পথচারীরা মারা যান, যার বড় একটি অংশই বয়স্ক মানুষ ও শিশু। অতিরিক্ত গতি এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবই এর প্রধান কারণ। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে শুধু মানুষের জীবনের ক্ষতি হচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক সংকট। বিশ্বব্যাংকের একটি পরিসংখ্যান বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় $১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সমমূল্যের আর্থিক ক্ষতি হয়।
হাওয়া বেগমের এই অকাল মৃত্যু স্থানীয় মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তারা অবিলম্বে আলুকদিয়া বাজার এলাকায় স্পিডব্রেকার তৈরি এবং ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত নজরদারির জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিহতের পরিবার ঘাতক পিকআপ চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের জীবন এভাবে সড়কে পিষ্ট না হয়।
















