চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সিজারিয়ান অপারেশনের চার দিন পর এক প্রসূতির মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন শহরের ‘নিউ সেবা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’ ঝটিকা অভিযান চালায়। অভিযানে দেখা যায়, ক্লিনিকটির কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই এবং সেখানে রোগীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। এসব গুরুতর অনিয়মের কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত ক্লিনিকের মালিক সুজা উদ্দিনকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে তালাবদ্ধ করে সিলগালা ঘোষণা করা হয়।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জীবননগর শহরের হাসপাতাল রোডে অবস্থিত ওই ক্লিনিকে আকস্মিক এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি। এ সময় জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং থানার একদল পুলিশ সদস্য ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সরাসরি সহযোগিতা করেন। প্রশাসনের এমন সাঁড়াশি অভিযানে ক্লিনিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চার দিন আগে এক সন্তানসম্ভবা নারীকে প্রসববেদনা নিয়ে নিউ সেবা ক্লিনিকে ভর্তি করেন তাঁর স্বজনরা। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সিজারের প্যাকেজ বাবদ রোগীর পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা দাবি করে। কিন্তু সেখানে কোনো বিশেষজ্ঞ অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ওই প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশন করানো হয়। অপারেশনের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, উপযুক্ত চিকিৎসা ও জরুরি অক্সিজেনের অভাবে চার দিনের মাথায় রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এই মৃত্যুর হৃদয়বিদারক খবর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।
অভিযান পরিচালনাকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেখতে পান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০০% নিয়মের কোনোটিই এই ক্লিনিকে মানা হচ্ছিল না। ক্লিনিকে কোনো সার্বক্ষণিক এমবিবিএস ডাক্তার বা ডিপ্লোমাধারী নার্স ছিল না। এমনকি অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) থাকা বেশিরভাগ আধুনিক যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে ছিল। লাইসেন্সের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেলেও মালিক কোনো নবায়ন করেননি। অর্থাৎ সম্পূর্ণ অনুমোদনহীন ও জোড়াতালি দিয়ে বছরের পর বছর ক্লিনিক বাণিজ্য চলছিল। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, ক্লিনিকটিতে ৯০% সেবাই চলত আনাড়ি আয়া আর অদক্ষ সহকারীদের ওপর ভরসা করে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, সরকারি নীতিমালায় বলা আছে যেকোনো ক্লিনিকে সিজার করতে হলে অন্তত ১০টি বেড, ৩ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সার্বক্ষণিক ৬ জন প্রশিক্ষিত নার্স থাকতে হবে। অথচ এই ক্লিনিকে এগুলোর শূন্য শতাংশ বাস্তবায়ন ছিল। সব অনিয়ম হাতেনাতে ধরে ফেলার পর বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুযায়ী মালিক সুজা উদ্দিনকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ক্লিনিকের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। ক্লিনিকে থাকা সাধারণ রোগীদের দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি সাংবাদিকদের জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রসূতির মৃত্যুর বিষয়টি দেখে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে নামেন। তিনি বলেন, মানুষের অমূল্য জীবন নিয়ে কাউকে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। জীবননগর উপজেলায় প্রায় ২০ থেকে ২৫টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে যাদের কাগজপত্র ঠিক নেই এবং যারা মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনো অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে ১ দিনের জন্যও ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে একজন প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় মাত্র ৫ হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, একটি তাজা জীবনের ক্ষতিপূরণ কি মাত্র ৫ হাজার টাকা হতে পারে? তবে ক্লিনিকটি সিলগালা করায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা। তারা দাবি জানান, শুধু জরিমানা বা তালা ঝুলিয়ে ক্ষান্ত না হয়ে ভুল চিকিৎসায় জড়িত ভুয়া ডাক্তার ও মালিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হোক। যাতে ভবিষ্যতে কোনো ভুয়া ক্লিনিকের কারণে আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয়।
















