ছেঁড়া কাপড় প্যাঁচানো পায়ের কাছে কোটি ডলারের অস্ত্রের হার: মধ্যপ্রাচ্যের পাহাড়ে নতুন ইতিহাস

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পাহাড়ের খাঁড়া চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই পাহাড়ি মানুষটির দিকে ভালো করে তাকালে আধুনিক যুদ্ধবিজ্ঞানের সমস্ত যুক্তি ও হিসাব মুহূর্তেই গুলিয়ে যায়। তার পায়ে কোনো চকচকে সামরিক বুট নেই; রুক্ষ পাথরের ক্ষত থেকে পা দুটো বাঁচাতে কেবল গোলাপি কাপড় প্যাঁচিয়ে হলুদ দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা রয়েছে দুটো সাধারণ পুটলি। কাঁধে ধুলোমলিন এক টুকরো ছেঁড়া কেফিয়াহ, আর দুই হাতে শক্ত করে ধরা কয়েক দশকের পুরোনো মরচেপড়া একটি একে-৪৭ রাইফেল। আপাতদৃষ্টিতে রিক্ত ও সহায়সম্বলহীন এই মানুষগুলোই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক পরাশক্তিগুলোর কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র আর কোটি কোটি ডলারের সামরিক বাজেট নিয়ে ময়দানে নেমেও পরাশক্তিগুলো আজ খালি পায়ের এই অদম্য যোদ্ধাদের সামনে এসে কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না।

সমরক্ষেত্রের এই লড়াই মূলত প্রযুক্তির অহংকারের সাথে মানুষের অদম্য জেদের এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত। দৃশ্যত হতদরিদ্র এই মানুষগুলোকে পরাস্ত করতে আমেরিকা ও তাদের উপসাগরীয় মিত্ররা সাগরে ২০টির বেশি বিশাল যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে রেখেছে। আকাশ থেকে প্রতিনিয়ত ফেলছে শত শত টন ওজনের প্রিসিশন গাইডেড বোমা, যার একেকটির পেছনে খরচ পড়ে লাখ লাখ ডলার ()।পাহাড়িসুড়ঙ্গথেকেউড়েআসামাত্রদুইহাজারডলারেরসাধারণড্রোনকিংবাপুরনোরকেটধ্বংসকরতেতারানিক্ষেপকরছেচারমিলিয়নডলার()।পাহাড়িসুড়ঙ্গথেকেউড়েআসামাত্রদুইহাজারডলারেরসাধারণড্রোনকিংবাপুরনোরকেটধ্বংসকরতেতারানিক্ষেপকরছেচারমিলিয়নডলার(৪,০০,০০০) মূল্যের দামি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু এত বিপুল অর্থ আর অস্ত্রের অপচয় ঘটিয়েও দিনশেষে এই আগ্রাসী শক্তিগুলো রণক্ষেত্রে কোনো কৌশলগত অগ্রগতি অর্জন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।

যুদ্ধের মাঠের আসল চিত্রটি আরও অদ্ভুত ও নাটকীয়। যেসব নিয়মিত বাহিনীর সেনারা পায়ে দামি বিদেশি কমব্যাট বুট, শরীরে সুরক্ষিত কেভলার জ্যাকেট আর মাথায় আধুনিক প্রযুক্তির হেলমেট পরে মহড়া দিত, লড়াইয়ের মুখোমুখি হতেই তারা ভড়কে যাচ্ছে। খালি পায়ের লুঙ্গিপরা এই স্বাধীনতাকামী গেরিলাদের অতর্কিত পাল্টা আক্রমণের তোপে টিকতে না পেরে তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দেদারসে পিছু হটছে। জীবন বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক সাঁজোয়া যান, দূরপাল্লার কামান ও ভারী মারণাস্ত্র রাস্তায় ফেলে তারা দিগ্বিদিক পালিয়ে যাচ্ছে। দামি পোশাকে সজ্জিত ভাড়াটে বাহিনীর এই চরম পলায়নপর রূপ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশ্যে আসছে।

সমর বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই ভুলে যান যে, যুদ্ধ কখনোই পায়ের বুট দিয়ে জেতা যায় না; যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয় মাটির প্রতি আত্মিক টান আর মানুষের লড়াই করার ইচ্ছাশক্তির ওপর। যে মানুষটির পায়ে জুতো কেনার মতো সাধারণ সামর্থ্য নেই, কিন্তু যার পায়ের নিচে রয়েছে নিজের পূর্বপুরুষের রক্তে ভেজা পাহাড় আর ভিটেমাটি, তাকে কোনো শক্তির পক্ষেই চিরতরে দাস বানিয়ে রাখা যায় না। যার জীবনে আর কোনো কিছু হারানোর ভয় নেই, তাকে আকাশ থেকে ফেলা বোমার শব্দ বা সামরিক প্রেস রিলিজের ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে বশ করা যায় না। নিজের মাটির অধিকার রক্ষার সংকল্প এদেরকে পাহাড়ের মতোই অটল ও অপরাজেয় করে তোলে।

আগ্রাসী জোটগুলো ওয়াশিংটন বা তেলআবিব থেকে বড় গলায় বিবৃতি দিয়ে দাবি করে থাকে যে, বিমান হামলায় গেরিলাদের সামরিক সক্ষমতার প্রায় ৯০% পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের এই বাগাড়ম্বরকে সরাসরি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাথুরে সুড়ঙ্গের ভেতর টিমটিমে আলোয় কাজ চালিয়ে যায় স্থানীয় কারিগররা। মাটির নিচে বসে তারা ধ্বংসস্তূপের যন্ত্রাংশ কুড়িয়ে এনে আবার নতুন করে দূরপাল্লার মিসাইল অ্যাসেম্বল করে এবং নির্ভুল নিশানায় তা সমুদ্রের জাহাজে ছুড়ে মারে। শত শত টন বোমাবর্ষণ করেও মানুষের স্বাধীনচেতা মনোভাব আর টিকে থাকার কৌশলকে ধূলিসাৎ করা যায়নি।

বিশ্বজয়ের মোহে অন্ধ বড় বড় সাম্রাজ্য সবসময় ভুল বিশ্বাস নিয়ে এসেছে যে, কেবল অফুরন্ত টাকার জোর, বিমানবহর আর অস্ত্রের আধুনিকতা দিয়ে যেকোনো জাতিকে বশীভূত করা সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস বারবার সাম্রাজ্যের এই অন্ধ অহংকারকে চূর্ণ করেছে। ভিয়েতনামের গহীন জঙ্গল থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের রুক্ষ গিরিখাত এবং আজকের মধ্যপ্রাচ্যের এই লোহিত সাগরের উপকূল সবখানেই প্রমাণ হয়েছে যে, বুট পরা সুসজ্জিত সেনাদের চেয়ে মাটির সঙ্গে মিশে থাকা খালি পায়ের মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধ অনেক বেশি শক্তিশালী।

সম্পর্কিত নিবন্ধ