রাজধানীর ফুটপাতে কেনাকাটা করতে গিয়ে দরদাম করা সাধারণ মানুষের বহু পুরোনো অভ্যাস। কিন্তু সেই সাধারণ দরদামকে ঘিরেই গুলিস্তানের মতো ব্যস্ততম বাণিজ্য এলাকায় ঘটে গেল এক নজিরবিহীন তুলকালাম কাণ্ড। একটি শার্টের দাম ৩০০ টাকা চাওয়ার পর ক্রেতা ২০০ টাকা বলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দুই শিক্ষার্থীকে নির্দয়ভাবে মারধর করে ফুটপাতের একদল উগ্র হকার। তবে বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। মারধরের খবর ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। খবর পেয়ে প্রায় ৫০ জন ঢাবি শিক্ষার্থী লাঠিসোঁটা ও কাঠের বাটাম হাতে নিয়ে গুলিস্তানে জড়ো হন। শিক্ষার্থীদের এমন ভয়ংকর পাল্টা ধাওয়া ও মারধরের মুখে নিজেদের পণ্যভর্তি চৌকি ও জামাকাপড় ফেলে প্রাণভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় হকাররা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী নিজেদের ব্যবহারের জন্য কাপড় কিনতে গুলিস্তান পাতাল মার্কেট সংলগ্ন ফুটপাতে যান। সেখানে ফুটপাতের একটি অস্থায়ী দোকানে ঝোলানো শার্ট দেখে তারা বিক্রেতার কাছে দাম জানতে চান। বিক্রেতা প্রতিটি শার্টের দাম হাঁকান ৩০০ টাকা। তখন শিক্ষার্থীরা দাম কিছুটা কমিয়ে প্রায় ৩৩% ছাড়ে ২০০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। এক দামে পণ্য বিক্রি না হওয়ায় এবং ১০০ টাকা কম দাম বলায় ওই হকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অত্যন্ত অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ জানালে মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের আরও ১০ থেকে ১৫ জন হকার কাঠের বাটাম ও লোহার রড নিয়ে দুই শিক্ষার্থীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
আক্রান্ত দুই শিক্ষার্থী রক্তাক্ত ও আহত অবস্থায় কোনোমতে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের ফোনে বিস্তারিত জানান। সহপাঠীদের ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে এমন বর্বর হামলার খবর শহীদুল্লাহ হল ও জহুরুল হক হলসহ বিভিন্ন আবাসিক হলে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। কোনো কালবিলম্ব না করে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীর একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস, রিকশা ও মোটরবাইকে চড়ে দ্রুত গুলিস্তানের দিকে রওনা দেয়। তাদের অনেকের হাতেই ছিল কাঠের শক্ত বাটাম ও বাঁশের লাঠি। আহত বন্ধুদের ওপর অন্যায় আক্রমণের সমুচিত জবাব দিতে তারা সরাসরি ঘটনাস্থলে গিয়ে হকারদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।
শিক্ষার্থীদের এমন বিশাল দল ও আক্রমণাত্মক রূপ দেখে উপস্থিত হকাররা হতভম্ব হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে নেমেই হামলাকারী হকারদের চিহ্নিত করে পাল্টা ধাওয়া দেয় এবং হাতেনাতে পেয়ে বেধড়ক পেটাতে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের তীব্র আক্রমণের তোপে ফুটপাতের মাস্তান হকাররা কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। বাঁচার তাগিদে তারা নিজেদের ব্যবসার মূল আধার কাপড়ের চৌকি, জুতা ও টি-শার্টের পসরা ফেলে রেখে অলিগলির ভেতর দিয়ে চম্পট দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই গুলিস্তানের সেই চিরচেনা জনাকীর্ণ ফুটপাত একেবারে ফাঁকা ও খাঁ খাঁ করতে থাকে।
শিক্ষার্থী ও হকারদের এই রক্তক্ষয়ী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার কারণে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট থেকে পল্টন অভিমুখী সড়কের যান চলাচল শতভাগ (১০০%) বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার ওপর শত শত বাস, সিএনজি ও প্রাইভেট কার আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আশপাশের পথচারী ও দোকানদারদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, হকারদের ফেলে যাওয়া মালামাল পদদলিত হয়ে ও ভেঙে অন্তত ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ৬০০ ডলারের ($৬০০) সমান। খবর পেয়ে পল্টন ও মতিঝিল থানা পুলিশের একাধিক টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।
পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং মারধরে জড়িত দোষী হকারদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন। শিক্ষার্থীরা জানান, ফুটপাতে সাধারণ ক্রেতাদের জিম্মি করে মাস্তানি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। পুলিশের লিখিত আশ্বাসের পর প্রায় এক ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে দিতে পুনরায় ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে ফিরে যান। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চিহ্নিত হামলাকারীদের ধরতে রাতেই অভিযান শুরু হয়েছে। ফুটপাতে পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
















