ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। তাদের এই আকস্মিক সামরিক সাফল্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের ঐতিহাসিক বন্দর নগরী মোখা নিজেদের দখলে নেয় হুতি যোদ্ধারা। এতদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই উপকূলীয় বন্দরটি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হুতিরা শহরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি সেনারা কোনো বড় প্রতিরোধ ছাড়াই দ্রুত পেছনের দিকে সরে যায়। বিদ্রোহীরা শহরে ঢোকার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, নিমেষেই বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট এবং বহু পরিবার প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শহর ছাড়তে শুরু করে।
মোখা বন্দর নিজেদের কব্জায় নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি হুতি বাহিনী। শুক্রবার মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানায়, বিদ্রোহীরা এবার বাব আল-মানদেব প্রণালির ঠিক ভেতরে অবস্থিত অতি সংবেদনশীল পেরিম দ্বীপটিও দখল করে নিয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘মাইয়ুন’ নামে পরিচিত এই ছোট্ট দ্বীপটির অবস্থানগত গুরুত্ব অপরিসীম। এটি হাতছাড়া হওয়ার মধ্য দিয়ে পুরো লোহিত সাগর অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দ্বীপটি দখলের জবাবে সৌদি আরবের বিমানবাহিনী মোখা বিমানবন্দরে দফায় দফায় প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ করেছে। তবে বিমান হামলা চালিয়েও হুতিদের থামানো যায়নি; বরং লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মিলনস্থলে নিজেদের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেছে বিদ্রোহীরা।
উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সেখানে তীব্র মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই তুমুল লড়াইয়ের কারণে ইতিমধ্যে ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে ভিটেমাটিছাড়া হয়েছেন। খোলা আকাশের নিচে কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার ও পানির সংকটে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন এই উদ্বাস্তুরা। সাধারণ মানুষ এখনও নিশ্চিত নন হুতি বাহিনী ঠিক কোন সীমানা পর্যন্ত তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে। পেরিম, হানিশ দ্বীপ এবং মোখা ও ধুবাব উপকূলীয় শহরের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ পুরো অঞ্চলে এক ভীতিকর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে সৌদি আরব। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল আগে থেকেই মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিরাপদে রফতানি করতে সৌদি প্রশাসন লোহিত সাগরের বিকল্প নৌপথের ওপর প্রায় ৭০% থেকে ৮০% পর্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এখন বাব আল-মানদেব হুতিদের মুঠোয় চলে যাওয়ায় সেই পথটিও চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ($১০০) ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের ব্যয় অন্তত ২০% থেকে ২৫% বৃদ্ধি পাবে।
হুতিরা প্রকাশ্য বার্তায় জানিয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্যের সাধারণ জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এবং তাদের এই কঠোর নৌ-অবরোধ কেবল সৌদি আরব ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জাহাজের বিরুদ্ধেই কার্যকর হবে। তবে আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা পুরোপুরি কাটছে না। বাব আল-মানদেব প্রণালির সংকীর্ণ জলসীমায় ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ফাঁদ পেতে যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে জিম্মি করার পূর্ণ সামর্থ্য এখন হুতিদের হাতে রয়েছে। এই আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং চলমান যুদ্ধে ইরানকে একচ্ছত্র সুবিধা এনে দিতে বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে।
২০২২ সাল থেকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ অনেকটাই থমকে ছিল এবং আন্তর্জাতিক মহল সেখানে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু হুতিদের এই আকস্মিক উপকূল দখল সেই শান্তির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি চুরমার করে দিল। বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ধমনী এভাবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় রিয়াদ এবং ওয়াশিংটনের কৌশলগত নীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ফলে লোহিত সাগরে যে আন্তর্জাতিক সংঘাতের আগুন নতুন করে জ্বলে উঠতে যাচ্ছে, তা শুধু ইয়েমেনের সীমানায় আটকে থাকবে না, বরং তা গোটা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
















