দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন: সদস্য না হয়েও আলোচনার কেন্দ্রে ট্রাম্পের শুল্ক ও ডলারের লড়াই

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ শনিবার শুরু হচ্ছে দুই দিনের ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। জোটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বৃহৎ শক্তিগুলো। তবে সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও এই সম্মেলনের প্রতিটি টেবিলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাত এবং হোয়াইট হাউসের একের পর এক কড়া বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের হুমকি আন্তর্জাতিক বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে ব্রিকস নেতারা কীভাবে পা ফেলবেন, তা দেখতে তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।

বিশ্বমঞ্চে ব্রিকস জোটের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জোটভুক্ত ১১টি দেশ একাই ধারণ করছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯% এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০%। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৬% এখন এই দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে। নিজেদের আর্থিক ভিত শক্ত করতে জোটটি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)। সেই সঙ্গে সদস্যদেশগুলোর যেকোনো জরুরি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্য ব্রিকস ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের ($১০০ বিলিয়ন) একটি বিশেষ আপৎকালীন তহবিলও গড়ে তুলেছে।

তবে জোটের এই বাড়তি শক্তির ওপর কড়া নজর রাখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশেষ করে বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একক আধিপত্য কমাতে ব্রিকস দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বা ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রক্রিয়া ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করেছে। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো দেশ যদি ডলারের বিকল্প মুদ্রা তৈরির চেষ্টা করে, তবে তাদের পণ্যের ওপর ১০০% পর্যন্ত শুল্ক বসাবে আমেরিকা। এদিকে রাশিয়ার মতো দেশগুলো পশ্চিমাদের কঠোর নিষেধাজ্ঞায় থাকায় তারা নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইরানও এই দাবিতে সোচ্চার। কিন্তু ট্রাম্পের পাল্টা ব্যবস্থার ভয়ে অন্যান্য সদস্যদেশ এই পথে কতটা দ্রুত হাঁটবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

জোটের ভেতর সবচেয়ে বড় টানাপোড়েন চলছে সদস্যদের পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে। আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, সম্প্রসারিত ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য অনেক গভীর। একদিকে মস্কো ও তেহরান প্রকাশ্যেই আমেরিকাবিরোধী অবস্থান নিতে চায়। অন্যদিকে ভারত বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় ধরনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে দিল্লি কোনোভাবেই হোয়াইট হাউসকে খেপিয়ে তুলতে রাজি নয়। একই সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির কারণে তেহরানের কোনো চরম অবস্থানকে সমর্থন করবে না। ফলে সম্মেলন শেষে ওয়াশিংটনের সরাসরি সমালোচনা করে কোনো কড়া যৌথ বিবৃতি আসা প্রায় অসম্ভব।

কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা দিল্লিতে সম্মেলনের ফাঁকে বৈশ্বিক নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও নজর কাড়ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি শনিবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে মোদির বৈঠকের দিকেও সবার চোখ রয়েছে। সীমান্ত উত্তেজনা ও বড় অঙ্কের বাণিজ্যঘাটতির কারণে দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলার গতি কিছুটা মন্থর হলেও এ বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

দিল্লির জন্য এই সম্মেলনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সব পক্ষকে এক টেবিলে রেখে একটি গ্রহণযোগ্য যৌথ ঘোষণাপত্র আদায় করা। এর আগে মে মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরানের যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ভারত চায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অসংবাদিত নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে। যেখানে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় চীনের বিপুল বিনিয়োগের প্রভাব রয়েছে, সেখানে ভারত নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা প্রমাণ করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে মোদি সরকারের কূটনৈতিক জয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ