দীঘিনালায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান: পাহাড়ে টেকসই ভবিষ্যতের প্রত্যাশা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষায় তরুণ সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল এবং সুপেয় পানির সংকট দিন দিন প্রকট রূপ ধারণ করছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি যুবসমাজকে সরাসরি সম্পৃক্ত করে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বৃহস্পতিবার সকালে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। ‘ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফর সাসটেইনেবল বাংলাদেশ’ নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জলবায়ু ঘোষণা-২০২৬’ কর্মসূচির আওতায় এই সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে পাহাড় ধস ও ঝিরি-ঝরনা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রকৃতিকে নিজের মতো বাঁচতে দিতে হবে। নির্বিচারে পাহাড় কাটা এবং বন ধ্বংস বন্ধ করতে তরুণদেরই অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন তরুণদের যেকোনো পরিবেশবান্ধব ও সামাজিক উদ্যোগে শতভাগ (১০০%) সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন পাহাড়ি কৃষিতে আবহাওয়ার প্রতিকূল প্রভাব তুলে ধরেন। তিনি জানান, অসময়ে অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ খরার কারণে গত কয়েক বছরে স্থানীয় জুম চাষ এবং ফলবাগানের ফলন প্রায় ২৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে প্রান্তিক কৃষকরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার ($) বরাদ্দ এলেও তৃণমূল পর্যায়ের পাহাড়ি জনপদে তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় পাহাড়ি অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, হেডম্যান এবং কারবারিরা আলোচনায় অংশ নিয়ে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা উল্লেখ করেন, বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার কারণে পাহাড়ের প্রায় ৭০% প্রাকৃতিক ছড়া ও ঝরনা এখন পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি নারীদের কয়েক মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। পরিবেশের এই বিপর্যয় রুখতে প্রচলিত সামাজিক প্রথা ও আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তরুণদের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আয়োজক সংগঠন ‘ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফর সাসটেইনেবল বাংলাদেশ’-এর নির্বাহী পরিচালক তাওহিদুল ইসলাম এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি অফিসার অ্যানিকা তঞ্চঙ্গ্যা সভার মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরেন। তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জলবায়ু ঘোষণা-২০২৬ কেবল একটি কাগুজে প্রস্তাব নয়, বরং এটি পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার। পরিবেশ সংরক্ষণ, বনায়ন বৃদ্ধি এবং প্লাস্টিক দূষণ রোধে তরুণদের নেতৃত্বে স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশ টিম গঠন করা হবে। সংগঠনের অন্যান্য প্রতিনিধিরাও মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা ও নীতিগত সুপারিশমালা সভায় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় তরুণ-তরুণীরা পরিবেশ সুরক্ষায় নিজেদের দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, নিজের গ্রাম ও পাড়ায় বৃক্ষরোপণ অভিযান জোরদার করা এবং পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে তারা প্রস্তুত। তরুণদের মতে, পাহাড়ের সবুজ ও নদী-নালা রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই স্থানীয় তরুণরা প্রশাসনের সাথে মিলে প্রতিটি ইউনিয়নে পরিবেশ ক্লাবের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

দিনব্যাপী এই ফলপ্রসূ আলোচনার মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা স্থানীয় পর্যায়ের পরিবেশ সংকট সমাধানে একটি ঐক্যবদ্ধ রূপরেখা তৈরিতে একমত হন। উপস্থিত সকলে বিশ্বাস করেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চিরায়ত জ্ঞান এবং তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তির সঠিক প্রয়োগ ঘটলে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা সহজ হবে। পার্বত্য জনপদের শ্যামল রূপ অক্ষুণ্ণ রেখে একটি নিরাপদ, সবুজ ও জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনা সভা শেষ হয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ