পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া ঐতিহাসিক ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র পরিধি এখনই বাড়ছে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে ইসলামাবাদ। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, চুক্তিভুক্ত তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রাথমিক কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো নতুন দেশকে এই জোটে যুক্ত করার পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে তিন দেশের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়া ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মজবুত হওয়ার পর পরবর্তী ধাপে অন্যান্য দেশের জন্য এই জোটের দরজা খুলতে পারে।
মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান বলেন, মক্কা চুক্তি মূলত একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোট। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করাই এই সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে এই তিন দেশ নিজেদের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর ১০০% মনোযোগ দিচ্ছে। এই প্রাথমিক ধাপ সফলভাবে শেষ হলে যাদের সঙ্গে সদস্যদেশগুলোর অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিরক্ষা অবস্থান রয়েছে, তাদের এই জোটে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান পর্যায়ে জোট সম্প্রসারণের কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না।
গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সতর্কতার সঙ্গে এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি। চুক্তির সুস্পষ্ট শর্ত অনুযায়ী, এই তিন দেশের যেকোনো একটি দেশ যদি কোনো বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে তাকে বাকি সব সদস্যদেশের ওপর যৌথ আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে যেকোনো সংকটকালে তিন দেশ একে অপরকে সামরিক ও প্রযুক্তিগত পূর্ণ সহায়তা দিতে বাধ্য থাকবে। এই শর্তের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের তিন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি নিজেদের সুরক্ষা বলয় বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির পেছনে বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির সংযোগ ঘটেছে। একদিকে সৌদি আরবের রয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ($) মূল্যের বিপুল আর্থিক তহবিল ও উন্নত আধুনিক অস্ত্রের ভাণ্ডার। অন্যদিকে তুরস্কের রয়েছে বিশ্বমানের নিজস্ব সমরাস্ত্র শিল্প, যার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বিশ্ববাজারে প্রায় ৩০% থেকে ৪০% প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও প্রশিক্ষিত জনবল। ফলে এই তিন শক্তির সমন্বয়ে গঠিত বলয়টি বর্তমান ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।
চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত ৩১ আগস্ট তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিরা তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক যৌথ বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকে তিন দেশের শীর্ষ সামরিক ও কূটনীতিক কর্মকর্তারা চুক্তির কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। পাকিস্তানি মুখপাত্র জানান, নিয়মিত বিরতিতেই এই জোটের পরবর্তী বৈঠকগুলোর আয়োজন করা হবে। তবে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়সূচি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আলোচনার মাধ্যমে যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে। বর্তমানে চুক্তির নিয়মাবলি, যৌথ মহড়া ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
এদিকে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সম্প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশের যৌথ সম্মতির ওপর। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা যদি বাংলাদেশকে এই জোটে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করে, তবে ঢাকা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে ভেবে দেখবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও শান্তিরক্ষী হিসেবে বিশ্বজোড়া সুনাম এই জোটের জন্য ভবিষ্যতে বড় সম্পদ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সমান্তরালে মুসলিম বিশ্বের এই আত্মরক্ষা উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এখনই পরিধি না বাড়িয়ে তিন দেশ নিজেদের ভিত্তি শক্ত করার যে কৌশল নিয়েছে, তাকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বলছেন বিশ্লেষকরা। পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোনো সমমনা দেশ এই জোটে যুক্ত হতে পারবে কি না, তা জানতে হলে বিশ্ববাসীকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।
















