চুয়াডাঙ্গার উথলীতে বন্ধ ঘর থেকে দুর্গন্ধ: যুবকের ঝুলন্ত অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী বাজারে একটি তালাবদ্ধ নির্জন ঘর থেকে রবিউল ইসলাম (৩০) নামের এক যুবকের অর্ধগলিত ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার গভীর রাতে উথলী রেলস্টেশন সংলগ্ন বাজারপাড়ার একটি কক্ষ থেকে পুলিশ এই মরদেহ উদ্ধার করে। রবিউল স্থানীয় উথলী বাজারপাড়ার বাসিন্দা সালাম মোল্লার ছেলে। বেশ কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ থাকা এই যুবকের পচে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারের পর পুরো উথলী বাজার এলাকা জুড়ে চরম চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে আসে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার সকাল থেকেই উথলী রেলস্টেশনের আশেপাশের এলাকায় এক ধরণের উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। দিনভর বাজারের শত শত মানুষ ও ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন কোনো নালায় হয়তো কুকুর বা বিড়াল মরে পচে রয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে এবং দুর্গন্ধ এতই তীব্র আকার ধারণ করে যে বাজারের অন্তত ৮০% দোকানে বসে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে বের হন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। খুঁজতে খুঁজতে তারা রেললাইনের পাশের ওই পরিত্যক্ত প্রায় ঘরের সামনে এসে থামেন।

ঘরের দরজায় বাইরে থেকে শিকল ও ভেতর থেকে শক্ত করে খিল লাগানো দেখে স্থানীয়দের মনে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়। কোনো উপায় না দেখে রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করে ঘটনাটি জানান। খবর পেয়ে জীবননগর থানা পুলিশের একটি টহল দল মাত্র ২০ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সদস্যরা জানালার ফাঁক দিয়ে টর্চলাইটের আলো ফেলতেই ঘরের আড়ার সঙ্গে রবিউলের ঝুলন্ত নিথর দেহ দেখতে পান।

এরপর রাত ১২টার দিকে পুলিশ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে এবং ঝুলন্ত মরদেহটি নিচে নামিয়ে আনে। পুলিশ ও প্রতিবেশীরা জানান, নিহত রবিউল দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। মাদকের টাকার জন্য পরিবারে প্রায়ই অশান্তি হতো। একপর্যায়ে তিনি মানসিকভাবে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের সঙ্গেই তিনি আগে থাকতেন, কিন্তু মানসিক সমস্যা জটিল হওয়ায় গত কয়েক মাস ধরে তিনি একা এই ঘরে বসবাস করছিলেন।

স্থানীয় সচেতন বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় মাদকের আগ্রাসন খুব বেশি। এলাকার তরুণদের একটি বড় অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক মাদকাসক্ত যুবক প্রতি মাসে অন্তত $৬০ থেকে $১০০ ডলার সমমূল্যের অর্থ নেশার পেছনে নষ্ট করছে। অতিরিক্ত মাদক সেবনের কারণে প্রায় ২০% থেকে ৩০% তরুণের মধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। রবিউলের পরিবারও তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান শেখ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মরদেহের বেশিরভাগ অংশই পচে-গলে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল এবং শরীরে পোকা ধরেছিল। প্রাথমিক আলামত পর্যবেক্ষণ করে পুলিশ ধারণা করছে, অন্তত ৬ থেকে ৭ দিন আগেই রবিউল গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। দীর্ঘ সময় মরদেহটি বদ্ধ ঘরে ঝুলে থাকায় পচন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ শতভাগ নিশ্চিত করতে পুলিশ রাতেই মরদেহ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলে যুবকের মৃত্যুর আসল রহস্য জানা যাবে। রাত ১টার দিকে মরদেহটি হাসপাতালে পাঠানোর পর বাজারের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়। তবে এই মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো উথলীবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় অভিভাবকেরা অবিলম্বে বাজারে মাদক কেনাবেচা বন্ধে প্রশাসনের সরাসরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ