পাহাড়ি জনপদের শ্রমজীবী মানুষের দৃষ্টিজনিত সমস্যা দূর করে কাজের দক্ষতা ও আয়ের পথ সুগম করতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় শুরু হলো এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ‘রিডিং গ্লাসেস ফর ইমপ্রুভড লাইভলিহুডস’ (আরজিআইএল) শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্প। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গ্রিন হিল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনাইটেড পারপাস যৌথভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চক্ষুসেবা সংস্থা ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশ এতে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের চোখের আলো ফিরিয়ে দিয়ে তাঁদের স্বাবলম্বী করে তোলাই মূল লক্ষ্য।
সোমবার সকাল ১১টার দিকে দীঘিনালায় গ্রিন হিলের আয়োজনে এক বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী সভার মাধ্যমে এই কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে পিছিয়ে থাকা পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের চোখের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চশমা দেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশ এই প্রকল্পের আওতায় কয়েক হাজার মার্কিন ডলার ($) অর্থায়ন করেছে, যার ফলে তৃণমূলের স্বল্প আয়ের মানুষ নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের রিডিং গ্লাস পাবেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে চোখের প্রাথমিক স্ক্রিনিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তালজিল পারভেজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা কনিকা খীসা এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম। প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের রূপরেখা বিশদভাবে তুলে ধরেন ইউনাইটেড পারপাসের প্রজেক্ট ম্যানেজার রিপন আলী সরকার। পুরো অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সঞ্চালনা করেন প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর বিটু দত্ত। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন। বক্তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় বক্তারা বলেন, মানুষের বয়স ৪০ বছর পেরোলেই চোখের কাছের দৃষ্টি বা রিডিং পাওয়ার ধীরে ধীরে কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, উপযুক্ত একটি রিডিং গ্লাস ব্যবহারের ফলে একজন মানুষের কাজের উৎপাদনশীলতা প্রায় ৩২% থেকে ৩৫% পর্যন্ত বাড়ে এবং ব্যক্তির দৈনিক আয় প্রায় ২০% বৃদ্ধি পায়। অথচ প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় চোখের কোনো আধুনিক হাসপাতাল বা অপটিক্যাল শপ না থাকায় প্রায় ৮০% মানুষ চোখের সমস্যায় ভুগেও কোনো সমাধান পান না। দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার কারণে অনেকেই অকালে কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, যা পুরো পরিবারের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই সংকট দূর করতেই আরজিআইএল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আয়োজকরা জানান, প্রথম ধাপে দীঘিনালার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ শ্রমজীবী নারী ও পুরুষের চোখ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হবে। বিশেষ করে যারা তাঁত বোনা, সূচিকর্ম, সেলাই কাজ, কাঠমিস্ত্রি, কৃষি এবং ছোটখাটো দোকান পরিচালনা করেন, তাঁদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হবে। শতভাগ (১০০%) নির্ভুল পাওয়ারের রিডিং গ্লাস সরবরাহের পাশাপাশি গ্রামবাসীদের চোখের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা হবে, যাতে অবহেলার কারণে কারও দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে না যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তালজিল পারভেজ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, মানুষের চোখের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে তাঁদের কাজের গতি বজায় থাকে এবং অর্থনীতি সচল থাকে। পাহাড়ি এলাকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এমন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া একটি প্রশংসনীয় কাজ। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি। এছাড়া বিশেষ অতিথি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে এমন সামাজিক ও স্বাস্থ্যসেবামূলক কাজে সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে আসা স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় ৯০% মানুষ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, সামান্য একটি চশমার অভাবে এলাকার অনেক বয়োবৃদ্ধ মানুষ দৈনন্দিন জরুরি কাজ করতে পারেন না। প্রকল্পটি পুরোদমে চালু হলে পাহাড়ি জনপদের মানুষ নতুন করে আশার আলো দেখতে পাবেন। আয়োজক সংস্থাগুলো আশ্বস্ত করেছে যে, দীঘিনালার সব প্রান্তে ক্যাম্প পরিচালনার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে রিডিং গ্লাস তুলে দেওয়া হবে, যা পাহাড়ি নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে এবং দরিদ্র পরিবারের দারিদ্র্য বিমোচনে দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখবে।
















