মণিরামপুরের ইত্যা বাজারে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে আহত ১০: দোকানপাট বন্ধ, এলাকায় চরম আতঙ্ক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ইত্যা গ্রামে একটি প্রেমঘটিত বিরোধ মীমাংসার সালিশ বৈঠককে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে ইত্যা বাজার ও আশপাশের এলাকায় চরম থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সোমবার পর্যন্ত আতঙ্কে বিএনপি সমর্থকদের বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং পুরো বাজার জামায়াত সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কাশিমনগর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইত্যা বাজারে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ওই প্রেমঘটিত সালিশের আয়োজন করেন। বৈঠক চলাকালে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ৩০ থেকে ৪০ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। সংঘর্ষে জামায়াত সমর্থিত পক্ষের ফজলুর রহমান (৪৫), আশরাফুল (৩৫) ও শামসুল হক (৩৬) রক্তাক্ত জখম হন। স্থানীয়রা তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

শনিবারের এই সংঘর্ষের পর থেকেই ইত্যা বাজারে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের জোরালো অভিযোগ, ঘটনার পরদিন রবিবার তাঁরা দোকান খুলতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকেরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং মারধর করে দোকানপাট বন্ধ করে দেয়। এ সময় নাসির উদ্দিন নামের এক মাংস ব্যবসায়ীর দোকান থেকে প্রায় আড়াই মণ গরুর মাংসসহ নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। এছাড়া সাদেক নামের এক যুবককে খোঁজার অজুহাতে সন্ত্রাসীরা দিনদুপুরে হায়দার আলী নামের এক ব্যক্তির বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে।

হামলা ও জোরপূর্বক দোকান বন্ধ রাখার কারণে ইত্যা বাজারের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বাজারের প্রায় ৮০% ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দাবি, চলমান এই অস্থিরতা ও দোকানপাটে লুটপাটের কারণে তাঁদের প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মার্কিন ডলার ($) সমমূল্যের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সোমবারও বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। গ্রামের দিনমজুর ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে। এলাকার প্রায় ৯০% গ্রামবাসী নতুন করে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কায় চরম উদ্বেগে দিন পার করছেন।

এদিকে ঘটনার পেছনে স্থানীয় পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যবসায়ীদের মারধর ও দোকান বন্ধ রাখা হলেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিট পুলিশের কর্মকর্তা এসআই তুহিন কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো তিনি অভিযুক্তদের সাথে বসে বাজারে চা পান করেছেন। কাশিমনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক মাস্টার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ এখানে কার্যত একতরফাভাবে জামায়াতের পক্ষ নিয়েছে এবং কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁরা বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, বিরোধের পর থেকেই জামায়াত সমর্থকরা বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক বহিরাগত অস্ত্রধারী ক্যাডার এনে ইত্যা বাজারে জড়ো করেছে। তাদের হাতে রামদা, বল্লম, লোহার রড, গাছিদা ও আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় সাধারণ মানুষ বাজারে যেতে ভয় পাচ্ছেন। বাজারে এমন মহড়ার কারণে আশপাশের গ্রামের সাধারণ বাসিন্দারা কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এর আগে বহিরাগত দুইজনকে দেশীয় অস্ত্রসহ আটক করে স্থানীয়রা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। তবে বিএনপি নেতাকর্মীদের তোলা এসব অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর কোনো দায়িত্বশীল নেতা সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করতে চাননি।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মণিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু সাইদ জানান, ইত্যা বাজারে প্রেমঘটিত একটি বিরোধের সালিশকে ঘিরেই দুই পক্ষের মধ্যে এই মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন এবং কয়েকজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং এখন নিয়মিত টহল দিচ্ছে। বাজারে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো পক্ষকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেওয়া হবে না এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ মাঠে সক্রিয় রয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ