মাত্র দুটি চাকার ওপর ভর করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। তবে সেই স্বপ্ন যখন রূপ নেয় পবিত্র কাবা শরিফ ছুঁয়ে দেখার অদম্য বাসনায়, তখন তা সাধারণ কোনো ভ্রমণ থাকে না। নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার তরুণ সজিব তালুকদার ইফরাম ঠিক এমনই এক সাহসিকতাপূর্ণ যাত্রায় নেমেছেন। তিনি উড়োজাহাজ বা অন্য কোনো বিলাসবহুল যানবাহনে নয়, নিজের সাধারণ একটি বাইসাইকেলে চেপে ৬টি দেশ পার হয়ে পৌঁছাতে চান সৌদি আরবে। সেখানে গিয়ে তিনি পবিত্র হজ পালন করবেন। ২৬ বছর বয়সী এই যুবকের এমন উদ্যোগ পুরো এলাকায় দারুণ কৌতূহল ও আলোড়ন তুলেছে।
সজিবের বাড়ি বেলাবো উপজেলার সররাবাদ ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম সালাউদ্দিন তালুকদার। গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে বেলাবো উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই দীর্ঘ সফরের সূচনা করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য সৌদি আরব হলেও মাঝপথে তাঁকে পাড়ি দিতে হবে ভারত, পাকিস্তান, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মুসলিম ও প্রতিবেশী দেশ। প্রায় ৮,৫০০ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে তাঁর সময় লাগতে পারে ৭ থেকে ৮ মাস। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ প্যাডেল চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
এই আন্তর্জাতিক সফরের জন্য সজিবকে বেশ আঁটঘাট বেঁধে নামতে হয়েছে। পাসপোর্ট, বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রসেসিং এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করতে তাঁর প্রায় ১০০% প্রস্তুতি শেষ করতে হয়েছে। ভিসা ফি, খাবার ও জরুরি ব্যয় মিলিয়ে পুরো অভিযানের জন্য তাঁর আনুমানিক বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ মার্কিন ডলার ($)। পথে রাত কাটানোর জন্য সাইকেলের পেছনে তিনি বেঁধে নিয়েছেন হালকা তাবু, স্লিপিং ব্যাগ, প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধপত্র, সাইকেল মেরামতের যন্ত্রপাতি এবং কিছু শুকনো খাবার। তিনি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা ও বিশ্রামের সময়সূচিও আগে থেকেই ঠিক করে নিয়েছেন। প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি কিংবা মরুভূমির বৈরী আবহাওয়া মোকাবিলা করেই তিনি এগিয়ে যাবেন।
দুঃসাহসী সজিবের জন্য দূরপাল্লার ভ্রমণ একেবারেই নতুন নয়। এর আগে তিনি নিজের দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সাইকেল চালিয়ে ভ্রমণ করেছেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার পথ তিনি একাই পাড়ি দিয়ে নিজের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, এই বয়সেই তিনি পৃথিবীর প্রায় ২৬টি দেশ ঘুরে দেখার বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ভ্রমণের প্রতি সজিবের রয়েছে ১০০% একাগ্রতা। পুরোনো সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে এবার বাইসাইকেলে বিশ্বভ্রমণের মতো এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
রোববার বেলাবো উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে যখন তিনি যাত্রা শুরু করেন, তখন সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় শত শত মানুষ সজিবকে বিদায় জানাতে ও দোয়া করতে উপস্থিত হন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বেলাবোর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজিজ পারতাম জায়েদ। তিনি সজিবের পিঠ চাপড়ে সাহস দেন এবং এই পবিত্র সফরের সাফল্য কামনা করেন। একই সঙ্গে দীর্ঘ পথে সজিবের সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য বিশেষ শুভকামনা জানান তিনি। তিনি বলেন, তরুণদের এমন আত্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় একাগ্রতা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
ছেলের এই কঠিন যাত্রায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাবা সালাউদ্দিন তালুকদার ও পরিবারের সদস্যরা। শুরুতে পরিবার কিছুটা দুশ্চিন্তায় থাকলেও সজিবের অটল মনোবল দেখে শেষ পর্যন্ত হাসিমুখেই সম্মতি দেন। গ্রামের মানুষ জানান, সজিব কেবল নিজের ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণ করছেন না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। এই যাত্রা সফল করতে এলাকার প্রায় ৯০% মানুষ স্থানীয় মসজিদে তাঁর জন্য দোয়া করেছেন, যেন তিনি নিরাপদে সৌদি আরব পৌঁছে নির্বিঘ্নে পবিত্র হজ শেষ করতে পারেন।
আজকের আধুনিক যুগে যেখানে মানুষ বিলাসবহুল বিমানে চেপে অল্প সময়ে হজে যায়, সেখানে সাইকেলে চড়ে এমন সফর সত্যিই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং এক তরুণ পর্যটকের অবিচল বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে থাকবে। সজিব প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল ইচ্ছা আর খাঁটি বিশ্বাস থাকলে মানুষ অসম্ভবকেও জয় করতে পারে। তাঁর এই সাইকেলযাত্রা দেশের অন্য তরুণদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা জুগিয়েছে। সব বাধা পেরিয়ে সজিব সুস্থ শরীরে কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন এবং লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে নিরাপদে দেশে ফিরবেন, নরসিংদীবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা।
















