দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন আনা এবং শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। আগামী ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ উপলক্ষে সারা দেশের বাছাইকৃত ১০০ জন সেরা শিক্ষককে এক লাখ টাকা করে বিশেষ অর্থ পুরস্কার ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হবে। রোববার সকালে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজিত জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির প্রথম বৈঠক শুরুর আগে সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের বিস্তারিত কথা জানান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, অতীতে এ পুরস্কারের আওতা খুবই সীমিত ছিল। আগে সারা দেশ থেকে মাত্র ১২ জন শিক্ষককে ২ লাখ টাকা করে মোট ২৪ লাখ টাকা দেওয়া হতো। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যাতে তৃণমূল পর্যায়ের গুণী ও দক্ষ শিক্ষকরা কাজের সঠিক স্বীকৃতি পান। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার এবার পরিধি বহুলাংশে বাড়িয়েছে। এবার ১০০ জন শিক্ষককে এককালীন ১ লাখ টাকা করে মোট ১ কোটি টাকা (যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $৮৫,০০০ ডলারের সমপরিমাণ) পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে। এ জন্য দেশব্যাপী স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সেরা শিক্ষক নির্বাচনের একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, একটি জাতির উন্নয়ন ও শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি হলেন আমাদের শিক্ষকরা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও যেসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে নিষ্ঠার সাথে পাঠদান করছেন, তাঁদের অনুপ্রেরণা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি আরও যোগ করেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকদের কাজের মূল্যায়ন না হলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। তাই ৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবসে জাতি তাঁদের এই ত্যাগ ও অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এবং তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি তুলে ধরবে।
শিক্ষকদের পেশাগত আচরণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার প্রসঙ্গেও খোলামেলা কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি মন্তব্য করেন, শিক্ষকরা নিজেদের মার্জিত ও শিক্ষিত আচরণ দিয়ে সমাজকে পথ দেখাবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু অযাচিত কর্মকাণ্ড শিক্ষাঙ্গনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি যুগোপযোগী আচরণবিধি ও নির্দেশিকা তৈরি করছে মন্ত্রণালয়। এতে শিক্ষক সমাজের মর্যাদা যেমন বাড়বে, তেমনি অনভিপ্রেত বিতর্কও বন্ধ হবে।
অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বকেয়া পাওনা মেটানোর বিষয়েও সুখবর দেন মন্ত্রী। তিনি নিশ্চিত করেন, ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছরের শিক্ষকদের নিজস্ব তহবিলের বা কন্ট্রিবিউশনের বকেয়া টাকা শতভাগ বা ১০০% পরিশোধ সম্পন্ন করেছে সরকার। এ ছাড়া সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া অবশিষ্ট অনুদানের অর্থও আটকে থাকবে না। ধাপে ধাপে সরকারি অংশের সব পাওনা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছাড় করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক বেসরকারি শিক্ষকদের বহুল প্রতীক্ষিত বেতন বৈষম্য দূর করার বিষয়ে আশার কথা জানান। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত নতুন জাতীয় পে স্কেলে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এগোচ্ছে। সরকারি কর্মচারীরা পে স্কেলে যে নির্দিষ্ট শতকরা বা % হারে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবেন, দেশের বেসরকারি শিক্ষকেরাও ঠিক একই অনুপাতে সেই সুবিধা নিশ্চিতভাবে পাবেন। ফলে শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের বিরাজমান বেতন বৈষম্য দূর হবে।
স্টিয়ারিং কমিটির এ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও জাতীয় কমিটির বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। সভায় উপস্থিত সবাই একমত পোষণ করেন যে, শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্মান বাড়ানো ছাড়া উন্নত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সরকারের এই সময়োপযোগী ও বহুমুখী সিদ্ধান্তগুলো শিক্ষক সমাজের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনা ও ব্যাপক আশার আলো সঞ্চার করবে।
















