বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভিডিও বানিয়ে গ্রেপ্তার কলেজছাত্র সিফাত: তদন্তে মিলল তিন মিটারের হিসাব

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নিজের বাড়ির বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক বেশি আসার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতি-নির্ধারকদের গালিগালাজ করেছিলেন কলেজশিক্ষার্থী সিফাত আবদুল্লাহ। ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, মাত্র দুই মাসেই তাঁকে বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। এই বক্তব্যের জেরে গত বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সিফাতকে আটক করে এবং পরদিন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী এবং গাজীপুর মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের টিনের মসজিদ এলাকার বাসিন্দা সিকান্দার আলীর ছেলে।

ভিডিওতে তোলা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মাঠে নামে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। তদন্তে দেখা যায়, সিফাতের দাবি অনুযায়ী জুলাই ও আগস্ট এই দুই মাসে বিল সত্যিই ১০ হাজার টাকার বেশি এসেছে। তবে সেই বিল কোনো একক মিটারের নয়। টিনের মসজিদ এলাকায় সিফাতের বাবার মালিকানাধীন দোতলা ভবনে তাদের নিজেদের পরিবারের পাশাপাশি আরও দুটি পরিবার ভাড়া থাকে। ভবনটিতে পল্লী বিদ্যুতের মোট তিনটি পৃথক আবাসিক সংযোগ বা মিটার চালু রয়েছে। তদন্ত অনুযায়ী, তিন মিটারের সম্মিলিত বিল যোগ করলে দুই মাসে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮১ টাকা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $৯০ ডলারের সমান।

মিটারভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গ্রীষ্মের তীব্র গরমে জুলাই ও আগস্টে বিদ্যুৎ ব্যবহার এক লাফে ৫০% থেকে ১০০% পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। প্রথম মিটারে মে ও জুনে বিল এসেছিল যথাক্রমে ৩১৭ ও ৩৪২ টাকা, কিন্তু জুলাইয়ে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৮২ টাকা এবং আগস্টে ৫১৩ টাকা। দ্বিতীয় মিটারটিতে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে। এই মিটারে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ ৪০০ ইউনিট পুড়িয়ে বিল আসে ৩ হাজার ৫৯৪ টাকা এবং আগস্টে বিল হয় ২ হাজার ৩৯৭ টাকা। অন্যদিকে তৃতীয় মিটারে জুলাই মাসে ১ হাজার ৬৩৩ টাকা ও আগস্টে ১ হাজার ৩৬২ টাকা বিল আসে।

পল্লী বিদ্যুতের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে ওই বাড়ির তিনটি মিটার মিলিয়ে সর্বমোট ২ হাজার ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিভাগ মোট বিল আদায় করেছে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা। এর মধ্যে কেবল দ্বিতীয় মিটারটিতেই মোট বিলের প্রায় ৬০% খরচ হয়েছে, যার পরিমাণ ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা। মে মাসে তিনটি মিটারে মোট বিল ছিল ২ হাজার ৯৭৬ টাকা এবং জুনে ছিল ২ হাজার ৬১৬ টাকা। কিন্তু জুলাই মাসে তা এক লাফে বেড়ে ৬ হাজার ৪০৯ টাকায় এবং আগস্টে ৪ হাজার ২৭২ টাকায় দাঁড়ায়। পুরো বাড়ির তিনটি ভিন্ন পরিবারের বিল একসাথে যোগ করে সিফাত ভিডিওতে ক্ষোভ ঝেড়েছিলেন।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন মত তুলে ধরেছেন সিফাতের আইনজীবী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক আলী নাছের খান। তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, সিফাত ভিডিওতে খুব স্পষ্টভাবে দুই মাসের হিসাব তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ চার মাসের লম্বা হিসাব সামনে এনে গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, কোনো সাধারণ নাগরিকের ক্ষোভ প্রকাশকে ভিন্ন খাতে নিতেই এই অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বোর্ডবাজার আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আহসান কবীর বলেন, অভিযোগ শোনার পরপরই পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা সরেজমিনে তদন্তে যান। তারা মিটারের রিডিং দেখতে এবং বাসায় কী কী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চালানো হয় তা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সিফাতের বাড়ির লোকজন কোনো সহযোগিতা তো করেনইনি, উল্টো কর্মকর্তারা যাওয়ার পর প্রধান ফটক বন্ধ করে দেন। আহসান কবীর স্পষ্ট জানান, একটি বাড়িতে একাধিক মিটার থাকলে প্রতিটি সংযোগের বিল সম্পূর্ণ আলাদা। সব ভাড়াটিয়ার বিল একসঙ্গে মেপে একজন ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো অনুচিত।

সিফাত আবদুল্লাহ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া মামলার আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তাঁর পরিবার। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহারের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর ধারা প্রয়োগ করা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অনেকেই মনে করছেন, বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা ভদ্রোচিত না হলেও বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় আরও সংবেদনশীলভাবে দেখা যেত।

সম্পর্কিত নিবন্ধ