ইরান যুদ্ধ শেষের পর মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের নতুন চাল: সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি ও আঞ্চলিক জোটের তোড়জোড়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন আনতে অত্যন্ত গোপনে বড় প্রস্তুতি নিচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ওয়াশিংটনের বিদেশনীতি নতুন করে সাজাতে ট্রাম্পের দল এখন একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করছে। খসড়া পর্যায়ে থাকা এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কোণঠাসা করা, মার্কিন নেতৃত্বাধীন নতুন এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট গড়ে তোলা এবং আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক বহুগুণ বাড়ানো। এ আলোচনার বিষয়ে সরাসরি ওয়াকিবহাল চারজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা ও কূটনীতিক সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিশেষ পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ হলেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক ‘বড় কিছু’ করে দেখাবেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টসহ একাধিক নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিরা যৌথভাবে এই কৌশলের খসড়া প্রস্তুত করছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই কৌশল চূড়ান্ত হলে পুরো অঞ্চলে প্রায় $৫০ বিলিয়ন থেকে $১০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের নতুন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও যৌথ সামরিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের উপস্থিতি বজায় রেখে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে অন্তত ৭০% মার্কিন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন।

হোয়াইট হাউসের এই গোপন পরিকল্পনার তিনটি প্রধান দিক রয়েছে। প্রথমত, ইরানের আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলার লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা ফ্রন্ট গঠন করা। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজে প্রধান নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল, তার স্থায়ী অবসান চাইছে ওয়াশিংটন। এর অংশ হিসেবে ট্রাম্পের গাজা কৌশল দ্রুত বাস্তবায়ন করা, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে নতুন নিরাপত্তা চুক্তি সম্পন্ন করা এবং বিদ্যমান ইসরায়েল-লেবানন চুক্তিকে মাঠে কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয় ও সবচেয়ে প্রভাবশালী দিক হলো আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পরিধি দ্বিগুণ করা এবং ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি সম্পন্ন করা। কূটনীতিবিদরা মনে করছেন, সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি স্বাক্ষর নিশ্চিত করতে পারা হবে ট্রাম্পের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য। এ চুক্তি বাস্তবায়ন হলে মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যের পথ শতভাগ বা ১০০% উন্মুক্ত হবে এবং একই সাথে আরব বিশ্বে তেহরানের রাজনৈতিক দাপট এক ধাক্কায় একেবারে কমে যাবে। ফলে এই সম্ভাব্য চুক্তিকে ইরান যুদ্ধের পর পুরো অঞ্চলের জন্য বড় এক টার্নিং পয়েন্ট বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হতে পারে আসন্ন নির্বাচনের দিনক্ষণ। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপরের মাসেই নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা আশা করছেন, নির্বাচনের পর ইসরায়েলে যে সরকারই গঠিত হোক না কেন, তারা ওয়াশিংটনের এই নতুন কৌশলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে হাত মিলিয়ে কাজ করবে। তবে তেলআবিবের রাজনৈতিক হিসাবের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন মোটেই কালক্ষেপণ করবে না। নির্বাচনী ফলে নতুন কোনো রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হলেও ট্রাম্প নিজের পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়েছেন।

হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা যায়, ট্রাম্প সম্প্রতি তাঁর উপদেষ্টা দলের সঙ্গে দুটি আলাদা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কৌশলটির চূড়ান্ত খসড়া সবার সামনে আনতে আরও অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা থেকে শুরু করে রিয়াদ ও তেলআবিবের স্বার্থের টানাপোড়েন মেটানো মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণে সব দেশকে এমন একটি একক জোটে রাজি করানোকে প্রায় ৮০% ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যকে সম্পূর্ণ নিজেদের অনুকূলে সাজাতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে ট্রাম্প প্রশাসন। সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করে তেহরানকে পুরোপুরি একঘরে করাই এখন ওয়াশিংটনের মূল রণকৌশল। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যে এক ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ