পাহাড়ে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন স্বপ্ন: দীঘিনালায় নারীদের ধাত্রী ও যুবকদের কম্পিউটার শেখাচ্ছে সেনাবাহিনী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি জনপদে পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান বদলে দিতে এক মানবিক ও গঠনমূলক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দীঘিনালা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের নিজ পায়ে দাঁড় করাতে এবং কর্মমুখী দক্ষতায় পারদর্শী করে তুলতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ধাত্রী ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় দীঘিনালা জোনের অধীন তিনটি পৃথক ক্যাম্প বরাদম, বাবুছড়া এবং জারুলছড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুগান্তকারী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সূচনা হয়। সেনাবাহিনীর এই মহতী উদ্যোগ স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মাঝে নতুন উদ্দীপনা জুগিয়েছে।

দীঘিনালা জোন সূত্রে জানা গেছে, জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-আমিন, এসইউপি, পিএসসির প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় পুরো উপজেলা থেকে বাছাই করে মোট ৬৭ জন তরুণ-তরুণীকে এই কোর্সে যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দুর্গম পাহাড়ি জনপদের ২০ জন নারীকে উন্নত ধাত্রীবিদ্যা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে ৪৭ জন বেকার যুবককে দেওয়া হচ্ছে ব্যবহারিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। এ কোর্সের ১০০% ব্যয়ভার সেনাবাহিনী বহন করছে। প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াত থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।

পাহাড়ের ভৌগোলিক বাস্তবতায় এ প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। দীঘিনালার দুর্গম গ্রামগুলোতে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র সহজে পৌঁছানো যায় না। যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজও প্রায় ৭০% সন্তান প্রসব বাড়ির ভেতরেই ঘটে থাকে। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক সময় প্রসূতি মা ও নবজাতক ঝুঁকির মুখে পড়ে। সেনাবাহিনীর এই ধাত্রী প্রশিক্ষণ শেষ হলে গ্রামের নারীরা স্থানীয় পর্যায়েই নিরাপদ প্রসব সেবা নিশ্চিত করতে পারবেন। এতে করে প্রত্যন্ত এলাকার প্রসূতি মৃত্যুর হার বহুলাংশে কমে আসবে বলে আশা করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে পাহাড়ি যুবকদের পিছিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। ৪৭ জন তরুণকে কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, টাইপিং এবং ইন্টারনেটের প্রাথমিক ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোর্স শেষে তারা স্থানীয় বিভিন্ন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ফটোকপির দোকান, কম্পিউটারের দোকান কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সহজে কাজের সুযোগ পাবেন। এমনকি অনেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো অনলাইন কাজ করে মাসে $১০০ থেকে $২০০ ডলার আয় করার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করতে পারবেন। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার দ্রুত কমে আসবে এবং যুবসমাজ মাদক কিংবা বিপথগামিতা থেকে দূরে থাকবে।

প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে দীঘিনালা জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-আমিন বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার উন্নয়নে সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, পাহাড়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসা এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ তৈরি করাই এই উদ্যোগের আসল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতেও প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে এ জাতীয় জনকল্যাণমূলক বহুমুখী কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চালু থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

কোনো ধরনের ফি ছাড়া আধুনিক ও কার্যকর প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত প্রশিক্ষণার্থীরা। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিতে আসা তরুণরা জানান, উপজেলা শহরে গিয়ে অর্থ খরচ করে কোর্স করার সামর্থ্য অনেকেরই ছিল না। এখন বাড়ির কাছের ক্যাম্পে শিখতে পেরে তাদের জীবনের নতুন দ্বার খুলে গেছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থী নারীরা বলেন, এই প্রশিক্ষণ তাদের গ্রামে প্রসূতি মায়েদের পাশে দাঁড়ানোর সাহস জোগাবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলও সেনাবাহিনীর এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের আন্তরিক প্রশংসা করেন এবং এ ধারা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান।

পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়ন বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। দীঘিনালা জোনের নেওয়া এই বিশেষ প্রশিক্ষণ কেবল স্থানীয় বেকার সমস্যা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিই দূর করবে না, বরং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর আস্থা ও ভালোবাসার বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে। পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদের মানুষ এখন নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের নতুন আলো দেখতে পাচ্ছে, যার পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

সম্পর্কিত নিবন্ধ