অস্ত্রোপচারের ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা সংক্রমণ: পাবনায় প্রসূতি নারীদের জীবনে চরম বিপর্যয়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন পাবনার ফরিদপুর উপজেলার গৃহবধূ জয়া রানী দাস। কিন্তু সপ্তাহ পেরিয়ে মাস গড়ালেও তাঁর পেটের কাটা দাগ আর শুকায়নি। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নিয়মিত দামি অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধ খেয়েও কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো কাটা জায়গা দিয়ে প্রতিদিন পুঁজ ও দুর্গন্ধযুক্ত রস বের হতে থাকে। পরে রাজশাহীতে নিয়ে মাংসের বিশেষ পরীক্ষা করালে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে তিনি ক্ষতস্থানের যক্ষ্মায় আক্রান্ত। তবে জয়া রানী দাস একা নন, স্থানীয় আল–মদিনা ল্যাব অ্যান্ড হসপিটালে অস্ত্রোপচার করানো অন্তত ১২ জন নারী ও পুরুষের শরীরে এই একই মারাত্মক রোগের সংক্রমণ ধরা পড়েছে।

উপজেলা সদরের থানাপাড়া এলাকার প্রায় ২০ বছর বয়সী জয়া রানীকে গত ২২ মে ওই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল। ওই দিনই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর সন্তান পৃথিবীতে আসে। দুই দিন পর বাড়ি ফিরে তিনি নিয়মিত ক্ষতস্থান পরিষ্কার ও ড্রেসিং করান। কিন্তু ক্ষত না শুকানোয় চরম শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে বারবার ক্লিনিকে ছুটে গেলেও চিকিৎসকেরা সঠিক কারণ ধরতে পারেননি। অবশেষে গত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষায় তাঁর ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মা ধরা পড়ে। কাগজপত্রের তথ্যানুযায়ী, ২৫ জুলাই থেকে সরকারি কর্মসূচির আওতায় তিনি প্রতিদিন বিনা মূল্যের ওষুধ সেবন করছেন। রোগীর পরিবার জানায়, ভুল চিকিৎসার পেছনে তাঁদের জমানো প্রায় ২৫,০০০ টাকা বা প্রায় $২০০ খরচ হয়ে গেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত মে ও জুন মাসে এই হাসপাতালে প্রায় ১২০ জন প্রসূতির অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ১০% অর্থাৎ ১১ জন প্রসূতি নারী হাসপাতাল থেকেই এই জীবাণুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া পিত্তথলির পাথর অপসারণে অস্ত্রোপচার করানো এক পুরুষের শরীরেও একই রোগ শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, একটি ১০ শয্যার বেসরকারি হাসপাতাল চালাতে কমপক্ষে ৩ জন স্থায়ী এমবিবিএস ডাক্তার, ৬ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স এবং ৮০০ বর্গফুটের ওয়ার্ড থাকতে হয়। তবে ২০২০ সাল থেকে পরিচালিত এই ক্লিনিকটিতে এসব স্বাস্থ্যবিধির ৫০% শর্তও মানা হয়নি।

হাসপাতালটিতে প্রতি মাসে গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি অস্ত্রোপচার হতো, যা ছিল মালিকপক্ষের আয়ের প্রধান উৎস। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তাদের অপারেশন থিয়েটারে প্রসবের কোনো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মানা হতো না। সেখানে থাকা দুটি পুরোনো অটোক্লেভ মেশিন সঠিকভাবে কাজ করত না। অস্ত্রোপচারের কাঁচি, সুঁই ও অন্যান্য ধারালো যন্ত্রপাতি অপারেশনের আগে ১০০% জীবাণুমুক্ত করার কোনো প্রমাণও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। এ ঘটনার পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। স্বাস্থ্য বিভাগ ইতিমধ্যে হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য সিলগালা করে দিয়েছে। পাশাপাশি আইইডিসিআর এবং আইসিডিডিআর,বি-র একটি বিশেষজ্ঞ দল পাবনায় পৌঁছে সরেজমিন তদন্ত শুরু করেছে।

ক্লিনিকের অপরিচ্ছন্ন অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে রোগীদের দেহে যক্ষ্মা ছড়ানোর ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার একটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করানো ৫১ জন প্রসূতির শরীরে ক্ষতস্থানের যক্ষ্মা ধরা পড়েছিল। তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার পর মার্চ থেকে সেই ক্লিনিকের অপারেশন বন্ধ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, উত্তরবঙ্গের আরও ৪টি জেলার চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সিজারিয়ানের ক্ষত না শুকানোর সমস্যা নিয়ে তাঁদের কাছে প্রায় প্রতি মাসেই এমন রোগী আসছেন। যক্ষ্মাবিশেষজ্ঞরা জানান, অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি ঠিকমতো না ফুটিয়ে ব্যবহার করলে এই ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই মানুষের কাটা ক্ষতে বাসা বাঁধে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, পৃথিবীতে যক্ষ্মায় আক্রান্ত শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩,৫০,০০০ মানুষ নতুন করে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন এবং বছরে প্রায় ৪৪,০০০ রোগী প্রাণ হারান। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, শরীরের যেকোনো কাটা জায়গায় যক্ষ্মা হলে টানা ৬ মাস নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, যা একজন নতুন মায়ের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তাই অনুমোদনহীন ও নোংরা ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদি অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে দেশের প্রসূতি নারীদের জীবন আরও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ