নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম, তীব্র জ্বালানিসংকট এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ঢাকা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম অভিমুখে বিশাল লংমার্চ করেছে বিরোধী ১১–দলীয় ঐক্য। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে শত শত গাড়ির বহর নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হন জোটের শীর্ষ নেতারা। রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত গাড়ি বহরটি এখনো চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে পৌঁছায়নি। তবে আয়োজকেরা জানিয়েছেন, রাতে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছানোর পর ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে এক বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে এই কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে।
জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে ১১-দলীয় জোট এবার রাজপথে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেছে। এই দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান হলো অবিলম্বে গণভোটের গণরায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা এবং সারা দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকানো। এছাড়াও জোটের নেতারা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি সারের তীব্র সংকট দ্রুত মেটানো, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি কমানো এবং সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি স্তর থেকে সংকীর্ণ দলীয়করণ পুরোপুরি বন্ধ করার জোর দাবি জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনতেই তারা এই কর্মসূচি পালন করছেন বলে জানান।
শুরুর দিকে বিরোধী জোট জানিয়েছিল, লংমার্চের বহরে প্রায় ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ গাড়ি অংশ নেবে। তবে বর্তমান সময়ে দেশের তীব্র জ্বালানিসংকট এবং তেলের উচ্চমূল্যের বিষয়টি মাথায় রেখে নেতারা কৌশলী সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে এবং জ্বালানি অপচয় কমাতে বহরের গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৮০% কমিয়ে ১,০০০টিতে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় জোট। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জ ও কুমিল্লার সংযোগস্থলে অবস্থিত মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজার হিসাব থেকে জানা যায়, লংমার্চের ৬০০টিরও বেশি গাড়ি সুশৃঙ্খলভাবে টোল পরিশোধ করে নদী পার হয়েছে।
সেতু দুটির টোল আদায় সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বহরে থাকা গাড়ির মধ্যে প্রায় ৮৫% অর্থাৎ সাড়ে ৫০০টিরও বেশি ছিল বড় মাইক্রোবাস। এছাড়া বহরে বেশ কিছু জিপ, ব্যক্তিগত কার এবং কয়েকটি বড় বাসও ছিল। মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী সেতুর জন্য প্রতিটি মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত কারের নির্ধারিত টোল ৭০ টাকা। অন্যদিকে বাসের ক্ষেত্রে এই টোলের হার আরও কিছুটা বেশি ছিল। সব মিলিয়ে লংমার্চের বহর থেকে সওজ কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০,০০০ টাকারও বেশি বা প্রায় $৩৫০ সমমূল্যের টোল রাজস্ব আদায় করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই গাড়িগুলো স্বাভাবিকভাবে টোল দিয়ে সেতু পার হয়েছে।
এদিকে শুধু ঢাকা থেকেই নয়, লংমার্চের বহরটি মহাসড়ক ধরে যত সামনে এগিয়েছে, ততই এর আকার বড় হয়েছে। কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালীসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত গাড়ি বহরে যুক্ত হয়ে চট্টগ্রামের দিকে এগোতে থাকে। যাত্রাপথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একের পর এক পথসভা করেছেন জোটের নেতারা। সকালে শাপলা চত্বর ছাড়ার পর নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডের ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় প্রথম পথসভা হয়। এরপর দুপুরে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে দ্বিতীয় পথসভায় বক্তব্য দেন নেতারা। সেখানে জোহরের নামাজ ও দুপুরের খাবারের জন্য কিছু সময় বিরতি দেওয়া হয়।
বিরতির পর লংমার্চের বহর ফের যাত্রা শুরু করে এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বড় বড় পথসভা করে। এই কর্মসূচিতে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তাঁদের সঙ্গে আরও আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও এবি পার্টির সদস্যসচিব মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ শীর্ষ নেতারা। নেতারা বলেন, দেশের ৯০% মানুষ আজ ক্ষমতাসীনদের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে।
পথিমধ্যে মানুষের প্রচণ্ড ভিড় ও একাধিক পথসভার কারণে লংমার্চের গতি কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে। ফলে রাত ৮টা পর্যন্ত বহরটি চট্টগ্রাম মূল শহরে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে শত শত গাড়ির এই দীর্ঘ বহরকে স্বাগত জানাতে চট্টগ্রাম শহর ও এর প্রবেশমুখে হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছেন। নেতারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দলগুলো রাজপথ ছাড়বে না। লালদীঘি ময়দানের শেষ সমাবেশ থেকে আগামী দিনের আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
















