মাহিদুল ইসলাম হিমেল, হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
নোয়াখালীর হাতিয়ায় মেঘনা নদী ব্যবহার করে অবৈধভাবে মিয়ানমারে পণ্য পাচারের একটি বড় চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। শনিবার ভোররাতে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে প্রায় ৬০০ বস্তা সিমেন্টসহ ১২ জন পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে। চোরাচালান বিরোধী এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ দেশি পণ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা অবৈধ পথে সীমান্ত পার করার পরিকল্পনা ছিল পাচারকারী চক্রের।
ঘটনার বিস্তারিত জানা যায় কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের দেওয়া তথ্য থেকে। তিনি জানান, শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ভোর আনুমানিক ৫:৩০ মিনিটের দিকে কোস্ট গার্ড স্টেশন হাতিয়া গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, একদল পাচারকারী মেঘনা নদী দিয়ে বড় একটি চালান নিয়ে মিয়ানমারের দিকে রওনা হতে যাচ্ছে। খবর পাওয়ামাত্রই কোস্ট গার্ডের একটি চৌকস দল নদীতে বিশেষ টহল শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর সন্দেহভাজন দুটি বোটকে আসতে দেখে সেগুলোকে থামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বোটগুলো পালানোর চেষ্টা করলে ধাওয়া দিয়ে সেগুলোকে আটক করা হয়।
আটককৃত বোট দুটিতে তল্লাশি চালিয়ে কোস্ট গার্ড সদস্যরা ৫৯৫ বস্তা সিমেন্ট উদ্ধার করেন। পাচারকারীরা কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই এই বিপুল পরিমাণ মালামাল পাচার করছিল। উদ্ধারকৃত সিমেন্টের মোট ওজন প্রায় ২৯,৭৫০ কেজি। বর্তমান দেশীয় বাজারে এই সিমেন্টের আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ২,৯৭,৫০০ টাকা। কোস্ট গার্ডের মতে, পাচারকারীরা সরকারের ১০০% শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে এই অবৈধ ব্যবসায় লিপ্ত ছিল। ডলারের বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে দেশের বাজারে পণ্যের জোগান ঠিক রাখা জরুরি, সেখানে এ ধরনের পাচার দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।
অভিযান চলাকালে বোটের ভেতর থেকে ১২ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে যে, কোনো রকম সরকারি অনুমোদন ছাড়াই তারা এই সিমেন্টগুলো মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে এই সিমেন্টগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল তাদের। অভিযানে ব্যবহৃত দুটি ইঞ্জিনচালিত বোটও জব্দ করা হয়েছে। এই বোটগুলো ব্যবহার করেই তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মালামাল চোরাই পথে পাচার করে আসছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আটককৃত ১২ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। জব্দ করা ২৯,৭৫০ কেজি সিমেন্ট এবং বোটগুলো স্থানীয় থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাচারকারী চক্রের সাথে আর কারা জড়িত এবং তারা কোন রুটে এই কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন। এ ঘটনায় এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং পাচার রোধে কোস্ট গার্ডের এই সাফল্যকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়েছে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের জলসীমায় কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড বা চোরাচালান চলতে দেওয়া হবে না। বিশেষ করে মিয়ানমার সীমান্তে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এই অভিযানের ফলে প্রায় ৩০০,০০০ টাকার সমপরিমাণ দেশি সম্পদ পাচার হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। তিনি জানান, চোরাচালান ও অবৈধ পাচার রোধে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও ১০০% সফলতার সাথে অব্যাহত থাকবে। দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিমেন্টের মতো জরুরি নির্মাণ সামগ্রী পাচার হলে স্থানীয় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য পাচার করলে সরকার বড় অংকের রাজস্ব হারায়। আজকের এই অভিযানে ১২ জন পাচারকারীকে গ্রেফতার করা একটি বড় সাফল্য। এটি পাচারকারীদের জন্য একটি কড়া বার্তা হিসেবে কাজ করবে। তবে শুধু নদীপথে নয়, স্থলপথেও নজরদারি বাড়ানো দরকার যাতে চোরাকারবারিরা কোনো সুযোগ না পায়।
পরিশেষে, কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নাফ নদী এবং মেঘনা নদীর মোহনায় তাদের টহল দল সবসময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পাচারকারীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার চেষ্টা করলেও কোস্ট গার্ড তাদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। জনগণের জানমাল এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। আজকের এই সফল অভিযানের পর ওই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজন প্রতিটি নৌযান তল্লাশি করা হচ্ছে।
















