রাজশাহীর এক সম্মেলনে বেশ কড়া মেজাজেই কথা বললেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসার সরাসরি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনি কেন দেশের বাইরে থাকবেন? সাহস থাকলে দেশে আসেন। আপনি যত চোর-বাটপাড় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের সবাইকে নিয়ে একবারে ঢাকায় ফিরে আসেন। বাংলাদেশের জনগণ আপনাদের অপকর্মের হিসাব নিতে মুখিয়ে আছে।” শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জিয়া মঞ্চ’ রাজশাহী বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনার ঘন ঘন অডিও বার্তার প্রসঙ্গ টেনে গয়েশ্বর রসিকতা করে বলেন, “আমার আপা তো ইদানীং খুব আওয়াজ দিচ্ছেন যে তিনি ফিরবেন। আমি বলব, আওয়াজ না দিয়ে সাহস থাকলে সোজা দেশে চলে আসেন।”
বিএনপির এই প্রবীণ নেতা দলের তৃণমূল কর্মীদের প্রতি কিছু বিশেষ অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, গত ১৭ বছর ধরে আপনারা যে পরিমাণ জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তার প্রতিদান দেওয়ার সময় এখন। তবে এই প্রতিদান মানে ক্ষমতা দেখানো নয়, বরং জনগণের মন জয় করা। তিনি নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “আন্দোলন-সংগ্রামে আপনারা রাজপথে ছিলেন বলেই আজ ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। এখন আপনাদের উচিত সাধারণ মানুষের কথা শোনা। তাদের কী অভাব, তারা কী চায় সেগুলো বুঝতে হবে। আমরা যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে ১০০% দূরে সরে যাই, তবে বড় ধরনের ভুল করার আশঙ্কা থাকবে।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জনগণের সাথে দূরত্ব বাড়ালে সেটা দলের জন্য আত্মঘাতী হবে।
প্রশাসন প্রসঙ্গে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, এই সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রশাসনের মধ্যে ‘আওয়ামী ভূত’ পেয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের ভেতরে থাকা প্রায় ৮০% থেকে ৯০% কর্মকর্তা এখনো পেশাদার হতে পারেননি। এদের মধ্যে অনেকেই এখনো আগের সরকারের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছে। এই ‘আওয়ামী প্রেতাত্মা’দের নিয়ে ভালো কোনো কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। তাঁর মতে, প্রশাসনকে পুরোপুরি সংস্কার না করলে দেশের অবস্থা স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে না। তবে তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে, শুধু আগের সরকারের ব্যর্থতার দোহাই দিয়ে জনগণকে বেশি দিন অপেক্ষায় রাখা যাবে না। মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আগে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও প্রশাসনে পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনা জরুরি।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে গয়েশ্বর বলেন, বিগত ১৫ বছরে দেশ থেকে কয়েক হাজার কোটি ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আগের সরকারের দুর্নীতি আর ঋণের বোঝা বর্তমানে পাহাড় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, দেশের প্রতিটি মানুষের ওপর এখন লক্ষাধিক টাকার ঋণের বোঝা চেপে আছে। অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে হলে দুর্নীতি বন্ধ করা এবং রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধ করার বিকল্প নেই। দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যদি ১৭ বছর কষ্ট করে থাকতে পারি, তবে দেশের স্বার্থে আরও ২-৩ বছর কষ্ট করা আমাদের জন্য কঠিন কিছু নয়। ৫ বছরের কামাই যেন কেউ ৫ দিনে করার চেষ্টা না করে। অর্থাৎ, বাঁকা পথে অর্থ উপার্জনের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।”
বিএনপির ঘোষিত ‘৩১ দফা’ কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, এই দফাগুলো এখন আর শুধু তারেক রহমান বা বিএনপির নয়, এটি এখন বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি। মানুষ এই ৩১ দফার বাস্তবায়ন দেখতে চায়। তিনি বলেন, জনগণ একটি সুন্দর, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে এবং বিএনপি সেই স্বপ্ন পূরণে ১০০% অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই বলে তিনি সতর্ক করে দেন। তাঁর মতে, পরাজিত শক্তি এখনো সুযোগের অপেক্ষায় আছে এবং যেকোনো মুহূর্তে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। তাই নেতা-কর্মীদের অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থাকতে হবে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চের ঘোষণাকে ব্যঙ্গ করেন। শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে তাদের এই লংমার্চের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বলেন, “মাঝেমধ্যে মনে হয় তারা বেহেশতের টিকিট বিক্রি করছে। এখন হয়তো বেহেশতটা আসলে কোথায়, সেই ঠিকানা খুঁজতেই তারা এই লংমার্চের আয়োজন করেছে।” এছাড়া তিনি সাগর-রুনি সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এতদিন পার হলেও কেন এই হত্যার বিচার পাওয়া গেল না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। তিনি বর্তমান সরকারকে এই খুনের প্রকৃত রহস্য বের করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।
সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহিন শওকত। জিয়া মঞ্চের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মো. ফয়েজ উল্ল্যাহ্ ইকবালের উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে আরও অনেক কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা বক্তব্য রাখেন। রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. মামুন অর রশিদ এবং সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমানসহ শত শত নেতা-কর্মী এই সম্মেলনে অংশ নেন। পুরো আয়োজনজুড়ে নেতা-কর্মীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। সবাই আগামী দিনের আন্দোলন ও দেশ গড়ার কাজে ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ নেন।
সবশেষে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, সরকার গঠন করা মানে শুধু ক্ষমতার চেয়ারে বসা নয়, এটি একটি অনেক বড় দায়িত্ব। জনগণের আস্থা অর্জন করা যতটা কঠিন, তা ধরে রাখা তার চেয়েও বেশি কঠিন। তাই সবাইকে নীতি ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
















