উইপোকার যন্ত্রণায় মাঝরাতে সার্কিট হাউস ছাড়লেন বিরোধীদলীয় উপনেতা: কুমিল্লায় তোলপাড়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

একজন ভিআইপি অতিথি সরকারি মেহমানখানায় এসে উইপোকার কারণে শান্তিতে ঘুমানো তো দূরের কথা, সেখানে অবস্থানও করতে পারলেন না—এমন ঘটনা সচরাচর শোনা যায় না। কিন্তু ঠিক এমনটাই ঘটেছে কুমিল্লার সরকারি সার্কিট হাউসে। কক্ষের ভেতর উইপোকার উপদ্রব সহ্য করতে না পেরে রাত্রিযাপন না করেই ক্ষোভে সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে গেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। শুক্রবার দিবাগত রাত ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। এই ঘটনায় জেলা প্রশাসনের মধ্যে এখন চরম অস্বস্তি আর তোলপাড় চলছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় শুক্রবার রাতে। আজ শনিবার ৫ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের একটি বড় লংমার্চ শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই লংমার্চটি শেষ হবে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে। পথে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি বিশাল পথসভা করার পরিকল্পনা ছিল। সেই কর্মসূচির প্রস্তুতি নিতেই সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ঢাকা থেকে রওনা হয়ে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে এসে পৌঁছান। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর থাকার জন্য ‘রাধাচূড়া-২০২’ নম্বর কক্ষটি বরাদ্দ করা হয়েছিল। সাধারণত এই কক্ষটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্যই রাখা হয়।

রাত ১০টার দিকে তিনি যখন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে কক্ষে বিশ্রাম নিতে যান, তখনই অবাক হয়ে যান। কক্ষের আলমারি থেকে শুরু করে বিছানার চারপাশ উইপোকার দখলে। বিশেষ করে আলমারির ভেতরে রাখা বালিশ এবং কম্বলগুলো উইপোকা খেয়ে প্রায় নষ্ট করে ফেলেছে। অনেক জায়গায় পোকা বাসা বেঁধে রীতিমতো ঢিবি বানিয়ে ফেলেছে। কক্ষটির অবস্থা এমন ছিল যে, সেখানে প্রায় ১০০% জায়গা জুড়েই পোকার আনাগোনা ছিল। এমন নোংরা পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়া কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। এই দৃশ্য দেখে তাঁর সাথে থাকা সহকারী ও নেতা-কর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে সার্কিট হাউসের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীদের ডাকেন।

বিরোধীদলীয় উপনেতার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) আরিফুর রহমান জানান, উইপোকা দেখে তাঁরা সাথে সাথে কক্ষ পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। একই সাথে ভালো মানের কম্বলও চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর্মচারীরা বিষয়টি আমলে নিলেও দ্রুত কোনো বিকল্প কক্ষের ব্যবস্থা করতে পারেননি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে এপিএস কুমিল্লার এনডিসিকে (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা বা এসএমএস পাঠিয়ে পুরো বিষয়টি বিস্তারিত জানান। কিন্তু এরপরও যখন এক ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে গেল এবং নতুন কোনো থাকার জায়গা পাওয়া গেল না, তখন সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আর অপেক্ষা না করার সিদ্ধান্ত নেন।

অসহ্য পরিস্থিতির কারণে রাত ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে তিনি সার্কিট হাউস ত্যাগ করে অন্য জায়গায় চলে যান। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মু. মাহবুবর রহমান বলেন, “সার্কিট হাউসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এমন অব্যবস্থাপনা সত্যিই দুঃখজনক। একজন সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় উপনেতা আসার আগে তাঁর কক্ষটি অন্তত ১০০% পরিষ্কার করা হয়েছে কি না, তা দেখা কর্মচারীদের রুটিন কাজ ছিল। এই ঘটনা আমাদের প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।”

এদিকে জেলা প্রশাসন বলছে, তারা বিষয়টি জানার পরপরই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এনডিসি সাহেব খবর পাওয়ার সাথে সাথেই দায়িত্বরত কর্মচারীদের কক্ষ পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং উইপোকা পরিষ্কার করতে বলেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করার আগেই বিরোধীদলীয় উপনেতা স্থান ত্যাগ করেন। তিনি আরও জানান, এই ঘটনার জন্য ইতোমধ্যেই সার্কিট হাউসের আবাসন ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িতদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে ১০০% প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, সার্কিট হাউসের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি বছর যে পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ থাকে, তা ঠিকমতো ব্যবহার হচ্ছে কি না। সাধারণ হিসেবে, এই ধরনের ভিআইপি কক্ষ রক্ষণাবেক্ষণে মাসে অন্তত $১০০ থেকে $২০০ ডলারের (প্রায় ১২,০০০ থেকে ২৪,০০০ টাকা) সমতুল্য খরচ ধরা হয়। এরপরও যদি কক্ষের ভেতর উইপোকা বাসা বাঁধে, তবে সেটা কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ছাড়া আর কিছুই নয়। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এই ঘটনা কুমিল্লার আতিথেয়তার ওপর একটি বড় ধাক্কা। যেখানে বিদেশের অনেক কূটনৈতিক প্রতিনিধিও এই সার্কিট হাউসে থাকেন, সেখানে এমন নোংরা পরিবেশ দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কুমিল্লা শহরের অন্য একটি নিরাপদ স্থানে রাত কাটিয়েছেন এবং আজ সকাল থেকে তাঁর নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। তবে মাঝরাতে সার্কিট হাউস ছাড়ার এই খবরটি এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর নজরদারি চালাবে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, শোকজ আর তদন্তেই যেন বিষয়টি সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সরকারি স্থাপনাগুলোর সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। উইপোকার মতো সামান্য সমস্যার কারণে একজন রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার মানুষকে যেভাবে হেনস্তার শিকার হতে হলো, তা প্রশাসনের জন্য এক বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ