চুয়াডাঙ্গায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী: বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায় ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মোঃ মিনারুল ইসলাম

ভাদ্রের স্নিগ্ধ সকালে চুয়াডাঙ্গা শহর আজ এক অন্যরকম সাজে সেজেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পরম আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথি বা জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পুরো জেলায় বইছে উৎসবের হাওয়া। চুয়াডাঙ্গার আকাশ-বাতাস আজ শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে মুখরিত। ঢাক-ঢোলের শব্দে জানান দিচ্ছে মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের আগমনী বার্তা। জেলা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কগুলো এখন ভক্তদের পদচারণায় মুখর। দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় ভক্তিভরে প্রার্থনা করছেন হাজার হাজার নারী-পুরুষ। উৎসবের এই আমেজ কেবল মন্দিরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের হৃদয়েও।

আজ ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার সকাল থেকেই চুয়াডাঙ্গার বড় বাজার সংলগ্ন শ্রী শ্রী দুর্গা মণ্ডপ প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে শুরু করেন ভক্তরা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভক্তদের ভিড় বাড়তে থাকে। ছোট ছোট শিশুরা শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকার সাজে সেজে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে আসে, যা উপস্থিত সবার নজর কাড়ে। আয়োজক কমিটির দেওয়া তথ্য মতে, এবারের জন্মাষ্টমীতে চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রায় ৯৫% হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরিবার কোনো না কোনোভাবে এই উৎসবে সরাসরি শরিক হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে বড় বাজার দুর্গা মণ্ডপ থেকে একটি বিশাল ও বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। বর্ণিল ব্যানার, ফেস্টুন আর সুসজ্জিত ট্রাকে শ্রীকৃষ্ণের জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয় এই মিছিলে।

শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করার সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি করে। বড় বাজার থেকে শুরু হয়ে শহীদ হাসান চত্বর হয়ে মিছিলটি মাথাভাঙ্গা ব্রিজের মোড় ঘুরে সত্যনারায়ণ মণ্ডপে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় ভক্তরা খোল-করতাল আর ঢাকের তালে তালে হরিনাম সংকীর্তন করেন। আয়োজকরা জানান, এবারের আয়োজনকে সফল করতে তারা বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। উৎসবের বাজেট সম্পর্কে জানতে চাইলে এক সদস্য জানান, স্থানীয় ভক্তদের অনুদান এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ মিলিয়ে প্রায় ৩,৫০,০০০ টাকার (যা প্রায় $২৯০০ ডলারের সমান) একটি তহবিল গঠন করা হয়েছিল। এই অর্থ দিয়ে আলোকসজ্জা, প্রসাদ বিতরণ এবং শোভাযাত্রার খরচ মেটানো হয়েছে। কমিটির ১০০% সদস্যই এই আয়োজনে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন।

সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরার কারাগারে কংসের কারাগারে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যই তাঁর এই ধরাধামে আগমন। চুয়াডাঙ্গার প্রবীণ ভক্তরা বলেন, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ বর্তমান সমাজেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মানুষের সেবা করাই হলো প্রকৃত ধর্ম। মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া গৃহিণী মিতা রানী বলেন, “আমরা প্রতি বছর এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন পৃথিবীকে রোগ-শোক ও যুদ্ধের হাত থেকে মুক্তি দেন এবং সবার ঘরে শান্তি বজায় রাখেন।”

উৎসবকে কেন্দ্র করে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শহরের মোড়ে মোড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জন্মাষ্টমীর এই মিলনমেলায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ১০০% সতর্ক অবস্থানে আছেন। স্থানীয় মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মের মানুষজনও এই উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন, যা চুয়াডাঙ্গার দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে অনেক সাধারণ মানুষ ভক্তদের এই আনন্দযাত্রা উপভোগ করেন।

শোভাযাত্রা শেষে সত্যনারায়ণ মণ্ডপে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শনের ওপর আলোকপাত করেন। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আজ রাতভর বিভিন্ন মন্দিরে পূজা-অর্চনা, আরতি, ভজন কীর্তন এবং প্রসাদ বিতরণের কর্মসূচি রয়েছে। ভক্তরা উপবাস থেকে মধ্যরাতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের মুহূর্তে বিশেষ পূজা সম্পন্ন করবেন। আয়োজকরা জানিয়েছেন, রাত ১২টা ১ মিনিটে শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব পালন করা হবে এবং এরপর ভক্তদের মাঝে ফল ও মিষ্টি বিতরণ করা হবে। সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গায় আজ এক আধ্যাত্মিক ও আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করছে, যা মানুষের মনে নতুন আশার আলো জ্বেলে দিয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ