মরিচায় জবুথবু মার্কিন রণতরি: টানা ২৮৬ দিন সাগরে থেকে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর বেহাল দশা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে যখন বিশালাকার মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ নোঙর করল, তখন সেটি দেখে খোদ সামরিক পর্যবেক্ষকেরাই অবাক হয়ে গেছেন। প্রায় ১,১০০ ফুট লম্বা এই দানবীয় জাহাজের সামনের দিক থেকে শুরু করে পেছন পর্যন্ত পুরো কাঠামোতে মরিচা ধরে একাকার হয়ে গেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে জাহাজটি যেন বহু বছর ধরে কোনো পরিত্যক্ত জায়গায় পড়ে ছিল। অথচ এটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী একটি রণতরি। গত বুধবার থাইল্যান্ডের বন্দরে এটি পৌঁছালে এর বাইরের কঙ্কালসার অবস্থা সবার নজরে আসে।

এই বিশালাকার জাহাজের এমন করুণ অবস্থার পেছনে একটি বড় কারণ রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসে সান ডিয়েগোর ঘাঁটি ছেড়েছিল জাহাজটি। এরপর টানা ২৮৬ দিন এটি গভীর সাগরেই সময় কাটিয়েছে। সাগরে থাকার এই দীর্ঘ সময়ে জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধ এবং নৌ অবরোধে সরাসরি অংশ নিয়েছে। টানা ৯ মাসেরও বেশি সময় (অর্থাৎ অভিযানের প্রায় ৮৫% সময়) নোনা পানির সংস্পর্শে থাকায় লোহার এই কাঠামোয় জং বা মরিচা ধরাটা অনেকটা স্বাভাবিক ছিল বলে মনে করছেন সমর বিশেষজ্ঞরা।

মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল শুস্টার বিষয়টিকে একদম সাধারণ হিসেবেই দেখছেন। তিনি নিজে এই ধরনের নিমিৎজ-ক্লাস রণতরিতে তিনবার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মতে, কোনো জাহাজ যদি সাগরে টানা ৬০ দিনের বেশি সক্রিয় থাকে, তবে তার জলরেখা বা ওয়াটারলাইনে মরিচা ধরা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সাগরের লোনা পানি আর বাতাসের আর্দ্রতা খুব দ্রুত ইস্পাতের ক্ষতি করে। বিশেষ করে যুদ্ধের মতো চরম ব্যস্ত সময়ে এসব পরিষ্কার করার সুযোগ ক্রুদের থাকে না।

একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে মরিচা সরানো মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। এর জন্য ক্রুদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জলরেখা পর্যন্ত নিচে নামতে হয়। প্রথমে শক্ত হাতুড়ি বা বিশেষ যন্ত্র দিয়ে ঘষে ঘষে পুরনো মরিচাগুলো তুলতে হয়। এরপর এর ওপর দুই স্তর (২ পরত) মরিচারোধক রাসায়নিক উপাদান লাগাতে হয়। সবশেষে নৌবাহিনীর নির্দিষ্ট ধূসর রঙের আরও দুই স্তর প্রলেপ দিতে হয়। শুস্টার মনে করেন, পুরো জাহাজের মরিচা দূর করতে অন্তত ৩০ দিন বা এক মাস সময় নিয়ে সংস্কার কাজ চালানো দরকার। কিন্তু থাইল্যান্ডের এই সংক্ষিপ্ত সফরে সেটা করা সম্ভব নয়।

বর্তমানে থাইল্যান্ডের বন্দরে ক্রুদের একটু স্বস্তি ও বিশ্রামের জন্য জাহাজটি থামানো হয়েছে। সেখানে মাত্র ৭ দিনের যাত্রাবিরতি দেওয়া হতে পারে। এই অল্প সময়ের মধ্যে হয়তো জাহাজের খুব জরুরি কিছু অংশের কাজ করা হবে। বিশেষ করে জাহাজের সামনের ধনুকের মতো বাঁকানো অংশ, যা সারাক্ষণ ঢেউয়ের ঝাপটা সহ্য করে, সেটি আগে মেরামত করা জরুরি। কারণ মরিচা একবার শুরু হলে তা অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো পুরো জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে। এটি জাহাজের ডেক বা হাঁটার পথের ইস্পাতকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।

তবে আব্রাহাম লিংকনের এই দীর্ঘ অভিযানে শুধু মরিচা ধরাই একমাত্র সমস্যা নয়। টানা সাগরে থাকায় জাহাজে রসদ বা প্রয়োজনীয় জিনিসের টান পড়েছিল এবং নাবিকদের মনোবলও অনেকটা ভেঙে পড়েছিল। এমনকি এই অভিযানে এক নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ছিটকে পড়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব নিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেমন একটা চিন্তিত ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, এই অভিযানের সময়কাল খুব একটা দীর্ঘ ছিল না। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিজের যুদ্ধজাহাজ সবসময় ঝকঝকে রাখার পক্ষপাতী এবং প্রায়ই এ নিয়ে কর্মকর্তাদের তাগিদ দিতেন।

নৌবাহিনীর সাধারণ নাবিকদের কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর ও অপছন্দের কাজ হলো এই মরিচা পরিষ্কার করা। সাবেক কর্মকর্তা শুস্টার বলেন, নৌবাহিনীর চাকরিতে দুটি কাজ কেউ করতে চায় না। প্রথমটি হলো মরিচা ঘষে তোলা এবং দ্বিতীয়টি হলো জাহাজের নর্দমা বা পাইপ পরিষ্কার করা। তিনি যখন জুনিয়র অফিসার ছিলেন, তখন তিনিও এই কাজগুলোকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। কিন্তু জাহাজের স্থায়িত্ব রক্ষায় এই কঠিন কাজটি না করে কোনো উপায় নেই। এখন দেখার বিষয়, থাইল্যান্ডে কয়েক দিনের বিশ্রামের পর এই জং ধরা বিশালাকার জাহাজটি তার পুরনো জৌলুস ফিরে পায় কি না।

আধুনিক সমরবিদরা মনে করেন, রণতরিতে এই মরিচা পড়া আসলে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপের বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও অস্থিরতা চলার কারণে জাহাজগুলোকে বন্দরে ফেরার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে এই দানবীয় যুদ্ধজাহাজগুলো তাদের উজ্জ্বলতা হারিয়ে এমন জীর্ণ রূপ নিচ্ছে। তবে থাইল্যান্ডের বন্দরে অবস্থানকালে যদি বড় ধরনের কোনো মেরামত না করা হয়, তবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ভেতরের কাঠামো ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ