চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরকার পুরোনো কোন্দল আবারও রাজপথে নেমে এল। মঙ্গলবার দুপুরে সীতাকুণ্ড পৌর সদরে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতার অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় ছিল প্রকাশ্য দিবালোকে দুই যুবককে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে দেখা যাওয়া। এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। সীতাকুণ্ড পৌর সদরের হাসান গোমস্তা মসজিদ এলাকায় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই উত্তেজনা চলে, যা সাধারণ মানুষের জনজীবন লণ্ডভণ্ড করে দেয়।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পাঞ্জাবি ও জিনস পরা এক যুবক পিস্তল হাতে নিয়ে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করছে। আরেকটি ভিডিওতে অন্য এক যুবককে ধারালো দেশীয় অস্ত্র হাতে রণমূর্তি ধারণ করতে দেখা যায়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সংঘর্ষের সময় অন্তত ৪ থেকে ৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এ সময় রাস্তায় থাকা তিনটি মিনিবাস ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা। পরিবহন মালিকদের মতে, ভাঙচুর করা এই যানবাহনগুলো মেরামতের জন্য প্রায় ৫০০০$ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ খরচ হতে পারে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে দুই পক্ষের অন্তত ১০% থেকে ১৫% কর্মী সামান্য আহত হয়েছেন। দিনের আলোতে এমন অস্ত্র প্রদর্শন সীতাকুণ্ডের নিরাপত্তার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর অনুসারীদের মধ্যে এই বিরোধের সূত্রপাত। জানা গেছে, দুই পক্ষই সীতাকুণ্ডের ‘মুন স্টার ক্লাব’ প্রাঙ্গণে মঙ্গলবার বেলা ৩টার সময় দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের ডাক দিয়েছিল। পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই পক্ষকে আলাদা সময় বেঁধে দেয়। সালাউদ্দিনের পক্ষকে বেলা ২টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার শর্ত দিলেও সকাল থেকেই আসলাম চৌধুরীর সমর্থকরা ক্লাব এলাকায় অবস্থান নেয়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে তা প্রায় ১০০% নিশ্চিত।
কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, তাঁরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু আসলাম চৌধুরীর লোকেরা বহিরাগত সন্ত্রাসী ও পেশাদার অপরাধী নিয়ে এসে তাঁদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাঁর নেতা-কর্মীরা যখন ক্লাবের দিকে যাচ্ছিল, তখন প্রতিপক্ষ ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে সালাউদ্দিনের অনুসারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই লেন অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। এতে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং প্রায় ৬০ মিনিট যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে।
অন্যদিকে, আসলাম চৌধুরীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মোহাম্মদ মোরসালিন সব অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি তুলেছেন। তিনি জানান, সালাউদ্দিনের অনুসারীরাই বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে তাঁদের লোকজনের ওপর হামলা চালিয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় তাঁরা নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করে এল কে সিদ্দিকী স্কয়ারে তাঁদের কর্মসূচি পালন করেছেন। তিনি আরও দাবি করেন যে, কোনো ধরনের ককটেল বিস্ফোরণ বা অস্ত্র প্রদর্শনের সঙ্গে তাঁদের দলের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং প্রতিপক্ষ নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাঁদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। দুই নেতার এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সীতাকুণ্ড বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি কাজ করছে।
পুলিশ এই ঘটনার পর সীতাকুণ্ডজুড়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. রাসেল রাতে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাঁরা ইতিমধ্যে একজন অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করতে পেরেছেন। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশ সুপার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমানে সীতাকুণ্ডের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত ১০% পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে যাতে পুনরায় কোনো সংঘর্ষ না ঘটে।
সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর জানান, মহাসড়ক অবরোধের ফলে যানবাহনের লম্বা সারি তৈরি হয়েছিল, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়লেও পরে নেতাদের বুঝিয়ে সড়ক সচল করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে এমন অস্ত্র প্রদর্শন সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে। যদি দ্রুত এসব অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় আনা না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে অপরাধের মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে সীতাকুণ্ড পৌর সদরে থমথমে শান্ত অবস্থা বিরাজ করলেও ভেতরে ভেতরে চাপা উত্তেজনা রয়ে গেছে।
















