ঢাকার কাকরাইলে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৬৫০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। এদের মধ্যে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা, সাবেক উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, সাবেক বিচারপতি এবং দেশের নামকরা ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে এই যোগদানের আয়োজন করা হয়। মাসব্যাপী গণসংযোগ অভিযানের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াত এই দাওয়াতি সমাবেশের আয়োজন করেছিল। নতুন আসা এসব সদস্যদের ফুল ও ইসলামী বই দিয়ে বরণ করে নেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
যোগদানকারী ৬৫০ জন সদস্যের তালিকায় রয়েছেন নানা খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এস এম খালেকুজ্জামান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল ফারুক হোসাইন এবং বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক এসপি ওবায়দুল হক। এছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ঢাকার বংশাল থানা বিএনপির ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়াকুব সরকার জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। খেলাধুলা ও সামাজিক অঙ্গন থেকে জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার সেলিম আহমেদ এবং ধর্মীয় অঙ্গন থেকে নূরানী শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা জসিম উদ্দিনের যোগদান ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। উল্লেখ্য যে, যোগদানকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকে বছরে কয়েক মিলিয়ন $ (ডলার) সমমূল্যের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমি সব সময় মানুষের উপকারের চেষ্টা করি এবং অন্ততপক্ষে কারো ক্ষতি করা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখি। আমাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়, কিন্তু আমি তাতে আত্মতৃপ্তি পাই কারণ আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই।” যারা সমালোচনা করেন, তাদের জন্য দোয়া করার আহ্বান জানিয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তিনি বলেন, “তলোয়ারের খোঁচা একসময় শুকিয়ে যায়, কিন্তু মুখের কথার ক্ষত কখনো মোছে না। তাই আমাদের এমন ভাষায় কথা বলা উচিত নয় যা অন্যের কলিজা ছিঁড়ে ফেলে।” তিনি ১০০% স্বচ্ছতার সাথে রাজনীতি করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
কওমি মাদ্রাসা ও আলেমদের বিষয়ে জামায়াতের আমির তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা কওমি ভাইদের আলাদা করে দেখি না। তাদের দ্বীনি খেদমতকে আমরা অনেক বড় মনে করি। আল্লাহ যেন তাদের কাজে আরও বারাকা দান করেন।” কওমি আলেম মুফতি আবুল কালাম আজাদ এবং মাওলানা হাসান জামিলসহ বেশ কয়েকজন আলেম এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের সাথে পথচলার ঘোষণা দেন। আমিরের এই বক্তব্য উপস্থিত আলেম-ওলামাদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলে। অনেকে মনে করছেন, এর মাধ্যমে দেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান তাঁর কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, বাতেল বা অন্যায়ের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। কারো কাছে মাথা নত করার রাজনীতি জামায়াতে ইসলামী করে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “চলার পথে অনেক বাধা আসবে, সমালোচনা হবে, এমনকি জীবন দেওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে। আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যদি আল্লাহর রাস্তায় চলে যায়, তবে তাতে দুঃখ নেই। কারণ এই জীবন আমাদের নয়, এটি আল্লাহর দেওয়া আমানত। আমরা সেই আমানত আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে দিতে ১০০% প্রস্তুত আছি।” তাঁর এই বক্তব্যে মিলনায়তন জুড়ে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি জানান, ঢাকা মহানগরীতে জামায়াতের গণসংযোগ অভিযান অত্যন্ত সফলভাবে চলছে এবং মানুষের মধ্যে জামায়াতের প্রতি আস্থা আগের চেয়ে অন্তত ৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির হেলাল উদ্দিন, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন। বক্তারা বলেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে নীতিবান মানুষের রাজনীতিতে আসা জরুরি। ৬৫০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির এই যোগদান জামায়াতের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল বলে তাঁরা মনে করেন।
বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি মাগরিবের আজানের আগে শেষ হয়। যোগদানকারী ব্যক্তিরা জামায়াতের শৃঙ্খলিত পরিবেশ এবং আমিরের বক্তব্যে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা বলেন, তাঁরা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি নৈতিক সমাজ গঠনে কাজ করতে চান। এই সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী তাঁদের সাংগঠনিক শক্তির জানান দিল এবং আগামী নির্বাচনে বড় কোনো চমক দেখানোর প্রস্তুতি যে তারা নিচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এই মিলনায়তনে মানুষের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে যে, জামায়াতের প্রতি সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও সমর্থন দিন দিন বাড়ছে।
















