শৈলকুপার আকাশ-বাতাস আজ যেন এক পবিত্র সুরের মূর্ছনায় ভেসে বেড়াচ্ছে। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে গেঁথে দিতে শুরু হয়েছে এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসব। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে ১০ নম্বর বগুড়া ইউনিয়নের নাগিরাট মকরামপুর দাখিল মাদ্রাসা চত্বরে এই প্রতিযোগিতার শুভ উদ্বোধন করেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। ‘আগুয়ান সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ’ আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
মেধা ও মননের এই আয়োজনে বগুড়া ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে। সকাল থেকেই মাদ্রাসার আঙিনা মুখরিত ছিল শিশু-কিশোরদের পদচারণায়। ক্বিরাত, হামদ-নাত এবং মহানবীর (সা.) জীবনের ওপর উপস্থিত বক্তৃতা এই তিনটি বিভাগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিচারকদের মতে, অংশগ্রহণকারীদের পারফরম্যান্স ছিল ৮০% থেকে ৯০% নিখুঁত। ছোট ছোট শিশুদের কণ্ঠে যখন কোরআনের মধুর তিলাওয়াত ভেসে আসছিল, তখন উপস্থিত দর্শকদের চোখ আনন্দে ভিজে উঠছিল। আয়োজকরা জানিয়েছেন, উপজেলার মোট ১৪টি ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমে এই প্রতিযোগিতা চলবে এবং শেষে উপজেলা পর্যায়ে বড় পরিসরে সমাপনী অনুষ্ঠান হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, “আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের যদি আমরা শৈশব থেকেই রাসূল (সা.)-এর আদর্শে বড় করতে পারি, তবে সমাজ থেকে মাদক ও অপরাধ ১০০% নির্মূল হবে।” তিনি আরও বলেন, বর্তমান যুগে ইন্টারনেটের অপব্যবহার শিক্ষার্থীদের বিপথগামী করছে। তাই সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা ছাড়া আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বাঁচানো অসম্ভব। তিনি এই প্রতিযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আশ্বাস দেন যে, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন ভালো কাজে সব সময় পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে। তিনি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি নবীজির জীবন বেশি বেশি পড়ার পরামর্শ দেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি রাকিবুল ইসলাম খান দিপু। তিনি বলেন, রাজনীতি কেবল ভোটের লড়াই নয়, বরং সুন্দর সমাজ গঠনও রাজনীতির অংশ। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, মহানবী (সা.) ছিলেন মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাঁর জীবন নিয়ে পড়াশোনা করলে তোমাদের মেধা ও মননশীলতা বৃদ্ধি পাবে। এ সময় তিনি বিজয়ী এবং অংশগ্রহণকারী সবার জন্য শুভকামনা জানান। এমন একটি বিশাল আয়োজন সফল করতে আগুয়ান সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের কর্মীরা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন, যা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।
আয়োজক কমিটির একজন সদস্য জানান, পুরো উপজেলা ব্যাপী এই আয়োজন সম্পন্ন করতে প্রায় ১,০০,০০০ টাকারও বেশি বাজেটের প্রয়োজন হচ্ছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৫০থেকে৯০০ডলারের সমপরিমাণ। এই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে বিজয়ীদের আকর্ষণীয় পুরস্কার এবং ক্রেস্ট প্রদানের জন্য। শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টির পাশাপাশি তাঁদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করতে এই অর্থ ব্যয়কে তাঁরা একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এই মহতি উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন, যা আয়োজকদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে আসা এক অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলে হামদ-নাত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। আমরা খুবই খুশি যে আমাদের গ্রামে এত বড় একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এখনকার বাচ্চারা সারাদিন মোবাইলে গেম খেলে সময় নষ্ট করে, কিন্তু এই প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির জন্য সে গত ১০ দিন ধরে বই পড়ছে এবং প্র্যাকটিস করছে।” অভিভাবকদের মতে, এই ধরনের আয়োজন গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার যে ২০% থেকে ৩০% ব্যবধান রয়েছে, তা কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। এমন অনুষ্ঠান পাড়ায় পাড়ায় হওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।
উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা মহানবীর (সা.) কর্মময় জীবন থেকে ক্ষমা, ধৈর্য ও ত্যাগের শিক্ষা অত্যন্ত সাবলীলভাবে উপস্থাপন করে। দর্শকদের মধ্য থেকে অনেকে বলেন, তাঁরা অনেক কিছু নতুন করে জানতে পেরেছেন। বিশেষ করে নবীজির মক্কা বিজয়ের কাহিনী শুনে উপস্থিত সবার মাঝে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। পুরো অনুষ্ঠানটি সফল করতে মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট এবং শিক্ষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাঁদের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
শৈলকুপার এই সাংস্কৃতিক বিপ্লব কেবল একটি ইউনিয়ন বা মাদ্রাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পর্যায়ক্রমে এটি পুরো উপজেলার সব কটি ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়বে। আয়োজকরা আশা করছেন, এর মাধ্যমে অন্তত ১০০০০ শিক্ষার্থীর মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমের বীজ বপন করা সম্ভব হবে। পরিশেষে, মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে যেখানে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করা হয়। শৈলকুপার এই আয়োজন এখন পুরো জেলার মানুষের কাছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং সবাই বিজয়ী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানাচ্ছে।
















