দামুড়হুদায় মটর চুরি করতে গিয়ে করুণ পরিণতি: বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ গেল চিহ্নিত চোরের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলায় মটর চুরি করতে গিয়ে এক ব্যক্তির করুণ মৃত্যু হয়েছে। সোমবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩:৩০ মিনিটের দিকে উপজেলার লোকনাথপুর গ্রামে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। শফিকুল ইসলাম বরু নামের ৪৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি একটি বাড়ির পানির বৈদ্যুতিক মটর চুরি করতে গিয়ে সরাসরি বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে আসেন। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এলাকাবাসীর মতে, অসতর্কভাবে বিদ্যুতের মূল সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করেই কাজ শুরু করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অল্প কিছু টাকার জন্য চুরি করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণটাই খোয়াতে হলো তাকে।

নিহত শফিকুল ইসলাম বরু চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌর এলাকার শান্তিপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মৃত সিরাজুল ইসলাম। ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি এলাকায় বেশ পরিচিত ছিলেন, তবে তা মোটেও ভালো কোনো কাজের জন্য নয়। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার গভীর রাতে লোকনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা কেরামত আলীর বাড়িতে কেউ ছিল না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শফিকুল দেয়াল টপকে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল টিউবওয়েলের সাথে শক্তভাবে বসানো বৈদ্যুতিক মটরটি খুলে নিয়ে যাওয়া। বর্তমানে বাজারে একটি ভালো মানের পানির মটরের দাম প্রায় ৫০০০ থেকে ৮০০০ টাকার মধ্যে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৭০থেকে৮০ ডলারের সমান। এই সামান্য অংকের লোভে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, মটরটি খোলার সময় শফিকুল চরম অসাবধানতার পরিচয় দেন। তিনি মটরের সাথে থাকা বৈদ্যুতিক তারের মূল সুইচ বন্ধ করেননি। অন্ধকারে কাজ করার সময় প্রায় ২২০ ভোল্টের একটি সচল তার সরাসরি তাঁর শরীরের স্পর্শে লাগে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর তিনি চিৎকার করার বা নিজেকে বাঁচানোর কোনো সুযোগ পাননি। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে যখন বাড়ির মালিকের পরিচিত লোকজন এবং প্রতিবেশীরা টিউবওয়েলের কাছে যায়, তখন তাঁরা সেখানে শফিকুলের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। মরদেহটি মটরের সাথে এমনভাবে লেগে ছিল যে দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি এটি খোলার চেষ্টা করছিলেন।

এই ঘটনার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত উৎসুক মানুষ সেখানে ভিড় জমায়। খবর পেয়ে দামুড়হুদা মডেল থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। স্থানীয়রা পুলিশকে জানায়, শফিকুল এলাকায় একজন চিহ্নিত ও পেশাদার চোর হিসেবে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় একাধিক চুরির অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও প্রায় ৯০% থেকে ৯৫% ক্ষেত্রে তিনি চুরির অভিযানে সফল হলেও এবার ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ধরা পড়লেন মৃত্যুর কাছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, শফিকুল ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার ধরা পড়ে গণপিটুনির শিকারও হয়েছিলেন, কিন্তু তবুও তিনি চুরির নেশা ছাড়তে পারেননি।

দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মেসবাহ উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ টিম পাঠিয়েছি এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছি। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।” ওসি আরও জানান, শফিকুলের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক চুরির রেকর্ড রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে মনে হলেও পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও তিনি জানান।

এলাকাবাসীর দাবি, গত কয়েক মাসে এলাকায় চুরির উপদ্রব প্রায় ২০% থেকে ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কৃষকদের সেচ পাম্প এবং বাড়ির পানির মটর চোরদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। শফিকুলের এই মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে যেমন মানুষের মধ্যে স্বস্তি কাজ করছে, অন্যদিকে মৃত্যুটি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা নিয়ে আতঙ্কও রয়েছে। গ্রামবাসীরা এখন নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে আরও বেশি চিন্তিত। তাঁরা মনে করছেন, প্রান্তিক পর্যায়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লেও অসচেতনতার কারণে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।

মঙ্গলবার দুপুরে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশ এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শফিকুলের পরিবার এই ঘটনায় ভেঙে পড়লেও তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় তাঁদের বেশ বিব্রত হতে হচ্ছে। সমাজের সচেতন মহল মনে করেন, কর্মসংস্থানের অভাব এবং মাদকের নীল দংশন অনেককে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শফিকুলের এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি অপরাধের সমাপ্তি নয়, বরং এটি সমাজের অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ