চুয়াডাঙ্গায় গোসল করতে নেমে নিখোঁজ বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার: এলাকায় শোকের মাতম

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। সোমবার বিকেলে উপজেলার মাথাভাঙ্গা নদী থেকে ময়জান খাতুন নামের ৭৪ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর নদীর বুক থেকে তাঁর প্রাণহীন দেহটি ভেসে ওঠে। এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো মহেশপুর গ্রাম জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের পরিবারের সদস্যদের কান্নায় নদীপাড়ের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এই খবর শোনার পর থেকেই ভিড় জমাচ্ছেন ময়জান খাতুনের বাড়িতে।

ঘটনার শুরু হয় সোমবার ৩১ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ময়জান খাতুন বাড়ির কাছের মহেশপুর মোল্লাপাড়া ঘাটে গোসল করতে গিয়েছিলেন। তাঁর বয়স এখন ৭৪ বছর হলেও তিনি নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করতেন। কিন্তু নদীর তীব্র স্রোত আর বার্ধক্যের শারীরিক দুর্বলতা হয়তো সেদিন তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি যখন নদীতে নামেন, তখন পানির গতিবেগ বেশ বেশি ছিল। গোসল করার একপর্যায়ে তিনি গভীর পানিতে তলিয়ে যান এবং মুহূর্তের মধ্যেই চোখের আড়ালে চলে যান। বৃদ্ধা নারী সাঁতরে তীরে আসার চেষ্টা করলেও স্রোতের প্রতিকূলে তিনি পেরে ওঠেননি।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পরই স্থানীয় লোকজন উদ্ধারের জন্য নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গ্রামের যুবকেরা জাল ফেলে এবং নৌকা নিয়ে দীর্ঘ সময় নদীতে তল্লাশি চালায়। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তাঁর কোনো হদিস মিলছিল না। স্থানীয়দের মতে, বর্ষার মৌসুমে মাথাভাঙ্গা নদীর পানি সাধারণ সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০% থেকে ৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর এই প্রবল খরস্রোতা রূপের কারণে উদ্ধার কাজ চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবুও গ্রামবাসীরা হাল ছাড়েননি। অবশেষে দীর্ঘ তিন ঘণ্টার আকুল প্রচেষ্টার পর বিকেল ৫টার দিকে মহেশপুর ঘাট এলাকা থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে তাঁর মরদেহটি ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা।

খবর পেয়ে আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ গ্রামবাসীদের সহায়তায় মরদেহটি উদ্ধার করে ডাঙায় নিয়ে আসে। ময়জান খাতুন মহেশপুর এলাকার মৃত আকবার আলীর স্ত্রী ছিলেন। তাঁর এমন আকস্মিক বিদায়ে সন্তানদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, এই ঘাটে প্রতি বছরই এমন দুর্ঘটনা ঘটে। যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সচেতনতার অভাবে অনেক সময়ই সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকিতে পড়েন। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প থাকলেও গ্রামীণ এলাকার মানুষের পানির সুরক্ষা নিশ্চিতে তেমন কোনো বিশেষ বরাদ্দ চোখে পড়ে না। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা যেমন ইউনিসেফ বা বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে ১০০০০০০ $ ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দ করলেও তার সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বানী ইসরাইল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করতে পারেননি এবং পানিতে ডুবে শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেছেন। ওসি আরও জানান, পরিবারের কোনো অভিযোগ না থাকায় এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীকে বর্ষাকালে নদীতে নামার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এই হার সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলের প্রায় ৬০% মানুষ নিয়মিতভাবে নদী বা পুকুরের পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যথাযথ সাঁতার না জানা বা নদীর চোরা স্রোত সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেকেই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। স্থানীয় সমাজসেবকদের মতে, নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোতে যদি সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা যেত, তবে ময়জান খাতুনের মতো অনেক জীবনই বাঁচানো সম্ভব হতো।

মঙ্গলবার (১লা সেপ্টেম্বর) সকালে ময়জান খাতুনের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। দাফন এবং আনুষঙ্গিক খরচের জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ১০০০০ টাকা সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বৃদ্ধার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় এখনও শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা ময়জান খাতুনকে একজন ধার্মিক এবং পরোপকারী মানুষ হিসেবে জানতেন। তাঁর অকাল বিদায়ে পুরো মহেশপুর গ্রামে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। নদীর যে ঘাটে তিনি প্রতিদিন গোসল করতেন, আজ সেই ঘাটটিই তাঁর জীবনের শেষ স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ