বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বড় সুখবর নিয়ে এসেছে নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো-২০২৫। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই নতুন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারি চাকুরেদের মূল বেতন গ্রেডভেদে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত মিলিয়ে মোট ৩৩ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। এই পরিবর্তন কেবল বেতন বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পেনশন এবং বিভিন্ন ভাতাতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন এই বেতনকাঠামো গত ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হবে। তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিয়ে পুরো বেতন একবারে দেওয়া হবে না। এটি বাস্তবায়িত হবে দুই বছরে মোট তিনটি ধাপে। প্রথম ধাপে অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে মূল বেতনের ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় ধাপে ৩০ শতাংশ এবং একই বছরের জুলাই মাসে বাকি ৩০ শতাংশ বেতন দেওয়া হবে। বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা কার্যকর হতে সময় লাগবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, ২০টি গ্রেডেই বেতনের বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারী বর্তমানে যেখানে ৮ হাজার ২৫০ টাকা মূল বেতন পান, তা বেড়ে হবে ২০ হাজার টাকা। এটি প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ অর্থাৎ ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে, যা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি। সরকার বলছে, নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবার নিচের গ্রেডগুলোতে বেশি শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধানও আগের চেয়ে অনেকটা কমে এসেছে।
অবসরপ্রাপ্তদের জন্যও এবার রাখা হয়েছে বিশেষ সুবিধা। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। তবে আপাতত বিকল্প হিসেবে পেনশনের হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে। যারা বর্তমানে মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন পান, তাদের পেনশনের হার এক লাফে ১০০ শতাংশ বাড়বে। তবে যারা বেশি পেনশন পান, তাদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৫৫ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে। এটি বয়স্ক ও অবসরভোগীদের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবারের বেতনকাঠামোতে প্রথমবারের মতো কিছু নতুন ভাতার প্রচলন করা হয়েছে। আগে শুধু পঞ্চম গ্রেড বা তার উপরের কর্মকর্তারা মোবাইল ভাতা পেতেন, এখন থেকে ২০টি গ্রেডের সবাই এই সুবিধা পাবেন। এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে বিশেষ ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ডিজিটাল যুগের প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগের খরচ মেটাতে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি নিশ্চিত করেছেন।
তবে এই বিশাল বাজেট সামলানো সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রতি বছর সরকারের অতিরিক্ত খরচ হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের বর্তমান ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশের একটু বেশি। এই বিপুল অর্থের জোগান দিতে হলে সরকারকে রাজস্ব আদায় বা ট্যাক্স সংগ্রহের পরিমাণ ৪৬ শতাংশের বেশি বাড়াতে হবে। গত অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। তাই অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারি খাতের বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতের ওপরও বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কঠিন হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এই নতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কাজে গতিশীলতা আনবে। জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তাতে এই বেতন বৃদ্ধি ছিল সময়ের দাবি। তবে সরকার যদি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে ব্যর্থ হয়, তবে এই সুফলের পূর্ণ স্বাদ পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। জনবান্ধব প্রশাসন গড়তে এই নতুন কাঠামো কতটুকু ভূমিকা রাখে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
















