চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় মোহন আলী নামের ১৩ বছরের এক কিশোরের প্রাণ কেড়ে নিল বিষধর সাপ। গত শনিবার সকালে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার ঠিক পরেই তার মৃত্যু হয়। মোহন আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার গোবিন্দপুর মাঠপাড়ার মুরাদ আলীর একমাত্র ছেলে ছিল। সে স্থানীয় একটি স্কুলের ছাত্র। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটিতে এখন শোকের মাতম চলছে। এলাকার সাধারণ মানুষ এমন অকাল মৃত্যুতে একদম স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন।
ঘটনার শুরু হয় শুক্রবার রাতে। মোহন তার পরিবারের সাথে রাতের খাবার শেষে প্রতিদিনের মতো নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিন্তু রাত তখন আনুমানিক ৩টার মতো হবে, হঠাতই মোহনের তীব্র চিৎকার শুনে বাবা-মায়ের ঘুম ভেঙে যায়। তারা দ্রুত মোহনের ঘরে ছুটে যান এবং দেখেন সে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। মোহন জানায়, ঘুমের ঘোরে তার শরীরে কিছু একটা কামড় দিয়েছে। টর্চলাইটের আলোতে তারা খাটের আশেপাশে সাপ দেখতে পান। কোনো সময় নষ্ট না করে পরিবারটি দ্রুত তাকে আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দায়িত্বরত চিকিৎসকরা দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে এটি বিষধর সাপের কামড়। চিকিৎসকরা কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তখনই তাকে ১টি অ্যান্টিভেনম ডোজ প্রদান করেন। এই প্রতিষেধক দেওয়ার পর মোহনের শারীরিক অবস্থার সাময়িক উন্নতি হতে থাকে। চিকিৎসকরা প্রায় ৫০% থেকে ৬০% আশাবাদী ছিলেন যে সে সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু ঝুঁকি এড়াতে এবং উন্নত নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যরা একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে দ্রুত কুষ্টিয়ার পথে রওনা হন। কিন্তু কুষ্টিয়া পৌঁছানোর ঠিক আগেই হালসা নামক এলাকায় মোহনের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। সে বারবার বমি করতে শুরু করে এবং তার শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে যায়। সাপের বিষ তার শরীরের রক্ত ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলতে থাকে। যখন তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়, তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর ১০ মিনিটের মধ্যেই সব আশা শেষ হয়ে যায়।
মোহনে মৃত্যুতে গোবিন্দপুর এলাকায় নেমে এসেছে গভীর বিষাদ। তার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে পুরো গ্রামের মানুষ সেখানে ভিড় করেন। এলাকাবাসীর মতে, মোহন ছিল অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র স্বভাবের। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তার এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। তার বাবা মুরাদ আলী বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। তিনি বিলাপ করে বলছিলেন, “আমার একমাত্র প্রদীপ নিভে গেল, আমি কার জন্য এখন বেঁচে থাকব?” পরিবারটির একমাত্র ভবিষ্যৎ এভাবে হারিয়ে যাওয়ায় পাড়া-প্রতিবেশীরাও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা ও শরৎকালে সাপের উপদ্রব গ্রামের এলাকাগুলোতে অনেক বেড়ে যায়। আমাদের দেশে প্রতি বছর সাপের কামড়ে বহু মানুষ প্রাণ হারায়, যার মধ্যে প্রায় ৮০% ঘটনাই সঠিক সচেতনতার অভাবে ঘটে। মোহনের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হলেও সাপের বিষের তীব্রতা হয়তো অনেক বেশি ছিল। চিকিৎসকরা জানান, সাপের বিষ অনেক সময় হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, যা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
শনিবার বাদ মাগরিব গোবিন্দপুর গ্রামের কবরস্থান মাঠে মোহনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় এলাকার শত শত মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে গ্রামবাসী অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন। এই ঘটনাটি এলাকার মানুষকে আরও সতর্ক হওয়ার বার্তা দিয়ে গেল। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় ১০০% ক্ষেত্রে মশারি ব্যবহার এবং ঘরের আশেপাশে জঙ্গল বা আবর্জনা পরিষ্কার রাখার গুরুত্ব এখন সবাই নতুন করে উপলব্ধি করছেন।
বর্তমানে গোবিন্দপুর গ্রামের প্রতিটি ঘরেই শোকের ছায়া। আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। মোহনের অকাল বিদায় যেন এলাকার সবাইকে সাপের উপদ্রব সম্পর্কে আরও সজাগ করে তুলেছে। শোকাতুর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন প্রতিবেশীরা। বিষধর সাপের একটি কামড় যে একটি পরিবারের সব হাসি-খুশি কেড়ে নিতে পারে, মোহন আলীর মৃত্যু তার আরও একটি নিষ্ঠুর প্রমাণ হয়ে রইল।
















