ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানায় মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। গত দুই দিনের পৃথক অভিযানে ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেফতার এবং এক মাদকসেবীকে সাজা প্রদানের মাধ্যমে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লার নেতৃত্বে এই অভিযানগুলো পরিচালিত হয়, যার ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান ১০০% শক্তিতে অব্যাহত থাকবে।
প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় গত ৩০.০৮.২৬ তারিখ। এদিন শৈলকুপা থানার একটি চৌকস অফিসার ফোর্স ঝাউদিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক সেবন করা অবস্থায় রিয়াজ উদ্দিনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। ২৬ বছর বয়সী রিয়াজ উদ্দিন ওই এলাকার জিয়া শেখের ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, সে দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন করে আসছিল এবং এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিল। গ্রেফতারের পর তাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ৩৬(৫) ধারায় বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আসামী রিয়াজকে ০৫ (পাঁচ) মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। একই সাথে তাকে ৩০০০/- (তিন হাজার) টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
এই সাজা প্রদানের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকার অন্য মাদকসেবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, প্রকাশ্য দিবালোকে মাদক সেবন ও কেনাবেচার বিরুদ্ধে এমন কঠোর শাস্তি মাদকের বিস্তার রোধে সহায়ক হবে। শৈলকুপা থানা পুলিশ মনে করে, জরিমানার সাথে এই কারাদণ্ড মাদকাসক্ত যুবকদের সঠিক পথে ফিরে আসার একটি বড় বার্তা হিসেবে কাজ করবে। আইন অমান্যকারীদের জন্য কোনো ছাড় নেই এই নীতিতেই পুলিশ প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।
এদিকে, এই রেশ কাটতে না কাটতেই ৩১/০৮/২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ রাত ১২.৩০ মিনিটের দিকে পুলিশ আরও একটি বড় সাফল্য পায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শৈলকুপা থানাধীন ১৪ নং দুধসর ইউনিয়নের উজিরপুর গ্রামে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে বাজুখালী ব্রিজের পাশে মতিয়ার ফকিরের চায়ের দোকানের সামনে পাকা রাস্তার ওপর সন্দেহজনক কয়েকজনকে তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিকালে পুলিশ ৩৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে পুলিশ দুধসর গ্রামের লুতফর মন্ডলের ছেলে মোঃ সুজন মন্ডল (৩৩) এবং ব্রাহিমপুর গ্রামের উৎপল দাসের ছেলে প্রান্ত দাসকে (১৯) গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃত এই দুই যুবকের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য কেনাবেচার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। বিশেষ করে ১৯ বছর বয়সী প্রান্ত দাসের মতো তরুণদের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ওসি মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা। তিনি জানান, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। ৩৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার হওয়া এই অঞ্চলের মাদক চক্রের মূল শিকড় উপড়ে ফেলার অভিযানেরই একটি অংশ। পুলিশ আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জানতে পেরেছে যে তারা এই মাদক পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে সংগ্রহ করে শৈলকুপার বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করত।
শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, “আমরা মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপস করছি না। অভিযানে যেমন মাদকসেবীদের সাজা হচ্ছে, তেমনি কারবারিদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, অভিযানে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি মাদকের হিসাব রাখা হচ্ছে এবং এলাকার শান্তি বজায় রাখতে পুলিশ সদস্যরা দিনরাত কাজ করছেন। সাধারণ মানুষকে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশের একার পক্ষে সমাজ পরিবর্তন করা কঠিন, যদি না সাধারণ মানুষ মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে।
স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের এই সক্রিয় ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। উজিরপুর গ্রামের বাসিন্দাদের মতে, বাজুখালী ব্রিজ এলাকাটি রাতের বেলা মাদকের আড্ডায় পরিণত হয়েছিল। সেখানে ৩৪ পিস ইয়াবাসহ সুজন ও প্রান্তের গ্রেফতার হওয়াটা এলাকার তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে। প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ছে দেখে পুলিশও তাদের কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নিয়মিত টহল এবং আকস্মিক তল্লাশির কারণে অপরাধীরা এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে শৈলকুপা থানায় গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতে মাদকের স্পটগুলো চিহ্নিত করে আরও বড় ধরনের অভিযান চালানো হবে। ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় শৈলকুপা থানাকে শতভাগ মাদক মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েই এখন কাজ চলছে। এই অভিযানগুলোর মাধ্যমে অপরাধীদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, মাদক সেবন বা ব্যবসা কোনোটাই বরদাস্ত করা হবে না।
















