ঝিনাইদহে শোকের ছায়া: একদিনে পৃথক দুর্ঘটনায় ৭ জনের করুণ মৃত্যু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পৃথক পৃথক পাঁচটি দুর্ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। একদিনে এতগুলো মানুষের অকাল মৃত্যুতে পুরো জেলাজুড়ে এখন শোকের মাতম চলছে। নিহতদের মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক দম্পতি, বাসের নিচে পড়ে আরেক দম্পতি, সাপের কামড়ে এক শিশু এবং ট্রেনের ধাক্কায় এক বৃদ্ধ রয়েছেন। এছাড়া একজনের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

শৈলকুপা উপজেলায় সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে। সেখানে গরুর জন্য ঘাস কাটার মেশিনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক দম্পতি প্রাণ হারিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ৫২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি ঘাস কাটার মেশিনটি চালু করতে গেলে হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। তাকে বাঁচাতে গিয়ে তার স্ত্রীও বিদ্যুতায়িত হন। প্রতিবেশীরা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। গ্রামবাসীর দাবি, বিদ্যুতের তারে লিক থাকায় এই ১০০ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। এই ঘটনায় ওই এলাকায় অন্তত ৮০ শতাংশ মানুষ এখন আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছেন।

একই দিনে ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় আরও এক দম্পতি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। দ্রুতগামী একটি যাত্রীবাহী বাস মোটরসাইকেলে থাকা ওই দম্পতিকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই স্বামীর মৃত্যু হয় এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে স্ত্রীও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাসটি প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলছিল। ঘাতক বাসটিকে পুলিশ জব্দ করলেও চালক ও সহকারী পালিয়ে গেছে। সড়কে প্রতিদিনের এই বিশৃঙ্খলায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন প্রায় ০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এদিকে, শৈলকুপার অন্য একটি গ্রামে সাপের কামড়ে ৮ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশুটিকে বিষধর সাপে কামড় দেয়। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ওঝার কাছে নিয়ে সময় নষ্ট করলেও পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই শিশুটি মারা যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, সাপে কামড়ানোর পর ১ ঘণ্টার মধ্যে অ্যান্টি-ভেনম দিলে প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। কিন্তু অসচেতনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হয় না। গ্রামীণ জনপদে সাপের উপদ্রব বাড়ায় মানুষ এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

রেলপথের দুর্ঘটনাও বাদ যায়নি এই তালিকায়। কালীগঞ্জ উপজেলায় রেললাইন পার হওয়ার সময় দ্রুতগামী ট্রেনের ধাক্কায় ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তিনি কানে কম শুনতেন বলে জানা গেছে। ট্রেনের ধাক্কায় তার দেহটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। স্থানীয়দের মতে, ওই এলাকায় কোনো রেলক্রসিং বা গেটম্যান না থাকায় প্রায়ই এমন দুর্ঘটনা ঘটে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় রেলপথে জীবনের ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিটি জীবনের মূল্য কোটি টাকার বেশি হলেও কর্তৃপক্ষের অবহেলা যেন কিছুতেই কমছে না।

সবশেষে মহেশপুর উপজেলায় এক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বাড়ির পাশের একটি গর্তে শিশুটির মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। পুলিশ বলছে, এটি দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে মরদেহের ময়নাতদন্তের পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। একদিনে এই ৭টি প্রাণহানির ঘটনা ঝিনাইদহবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রতিটি পরিবারে এখন কেবল কান্নার রোল। এই মৃত্যুগুলোর পেছনে অসচেতনতা ও অব্যবস্থাপনার দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।

জেলার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সড়ক ও বিদ্যুৎ লাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এমন লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত এসব দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। শৈলকুপা থেকে মহেশপুর পুরো জেলা এখন শোকাতুর। মানুষের দাবি, প্রতিটি মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অন্তত কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হোক। নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় ঝিনাইদহবাসী এখন প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ