চুয়াডাঙ্গায় প্রতারণার দায়ে জামান এগ্রো ফার্মকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা: অন্যের প্যাকেটে সার বিক্রির অভিযোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর উপজেলার হোগলডাঙ্গা গ্রামে আজ এক চাঞ্চল্যকর অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬) দুপুর ২টার দিকে জুমার নামাজের পরপরই যখন গ্রামবাসী বিশ্রামে ছিলেন, ঠিক তখনই হোগলডাঙ্গা গ্রামের মেসার্স জামান এগ্রো ফার্মে হাজির হন তদারকি কর্মকর্তারা। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান এক অদ্ভুত জালিয়াতির চিত্র। নিজেদের উৎপাদিত জৈব সার বাজারে পরিচিতি পাওয়ার আশায় অন্য নামী-দামী প্রতিষ্ঠানের প্যাকেট ব্যবহার করে বাজারজাত করছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এই জালিয়াতির অপরাধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জামান এগ্রো ফার্মকে নগদ ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা জরিমানা করেছে।

অভিযান চলাকালীন দেখা যায়, মেসার্স জামান এগ্রো ফার্মের মালিক মোছা. হাফিজা খাতুন তার কারখানায় বড় বড় নামী কোম্পানির খালি বস্তা ও প্যাকেট স্তূপ করে রেখেছেন। তারা নিজেদের তৈরি সাধারণ মানের জৈব সার ওইসব নামী প্যাকেটে ভরে সিলগালা করছিলেন। সাধারণ কৃষকরা যাতে প্যাকেট দেখে বিভ্রান্ত হন এবং ১০০% খাঁটি সার মনে করে চড়া দামে কেনেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই প্রতারণা চালানো হচ্ছিল। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, বাজারে এই ধরনের নকল সারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ফসলের উৎপাদন ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া কৃষকরা নামী ব্র্যান্ডের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন।

চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুনুল হাসান এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তিনি জানান, তারা দীর্ঘ দিন ধরেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর নজর রাখছিলেন। অভিযানে তারা প্রমাণ পান যে, জামান এগ্রো ফার্মের নিজস্ব কোনো বৈধ প্যাকেজিং ব্যবস্থা নেই। এমনকি তারা সরকারি কোনো লাইসেন্স ছাড়াই এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। জব্দকৃত সারের বাজার মূল্য প্রায় $৫০০ ডলারের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ সার যদি বাজারে চলে যেত, তবে কয়েকশ একর জমির ফসল মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই জনস্বার্থে এই জরিমানা এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অভিযানে শুধু ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তর নয়, বরং একটি সমন্বিত টিম কাজ করেছে। এতে সার্বিক সহযোগিতা করেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান। তিনি হাতে-কলমে পরীক্ষার মাধ্যমে দেখেন যে, প্যাকেটের গায়ে লেখা উপাদানের সাথে ভেতরের সারের কোনো মিল নেই। এছাড়া কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম এবং সরোজগঞ্জ ক্যাম্প পুলিশের একটি চৌকস দল নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। আভিযানিক দল যখন কারখানায় প্রবেশ করে, তখন কারখানার শ্রমিকরা নামী কোম্পানির প্যাকেটে সার ভরার কাজ প্রায় ৮০% শেষ করে ফেলেছিলেন। হাতেনাতে প্রমাণ মেলায় মালিক পক্ষ কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

শাস্তি হিসেবে শুধুমাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেই ক্ষান্ত হয়নি প্রশাসন। ভবিষ্যতে যেন এমন প্রতারণা আর না ঘটে, সেজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মালিক হাফিজা খাতুনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, অবিলম্বে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সকল লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে। এছাড়া নিজস্ব ব্র্যান্ডের নামে এবং নিজস্ব ডিজাইন করা প্যাকেটে সার বাজারজাত করতে হবে। যদি এরপরও অন্যের প্যাকেট ব্যবহার করার কোনো নজির পাওয়া যায়, তবে প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের জেল হাজতে পাঠানো হবে। প্রশাসনের এমন কড়া অবস্থানে হোগলডাঙ্গা গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে প্রায়ই এমন ভেজাল ও নকল প্যাকেটের সার পাওয়া যায়। এতে তাদের কষ্টার্জিত অর্থের অপচয় হয়। একজন স্থানীয় কৃষক বলেন, আমরা প্যাকেটের লোগো দেখে সার কিনি, কিন্তু ভেতরে কী আছে তা বোঝার উপায় থাকে না। সরকার যদি নিয়মিত এই ধরনের তদারকি চালায়, তবে প্রতারকদের হাত থেকে আমরা বাঁচতে পারব। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলায় সার ও কীটনাশকের বাজারে স্বচ্ছতা ফেরাতে তারা নিয়মিত নজরদারি করবেন এবং প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে এই ধরনের ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হবে।

বিকেলে জরিমানা আদায়ের পর সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুনুল হাসান উপস্থিত জনতাকে সচেতন করেন। তিনি বলেন, ক্রেতা হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। কোনো পণ্য কেনার সময় তার গায়ে উৎপাদনকারীর নাম, ঠিকানা এবং লাইসেন্স নম্বর আছে কি না তা যাচাই করা উচিত। শুধু সুন্দর প্যাকেট দেখে পণ্য কিনলে ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯৯% থাকে। জামান এগ্রো ফার্মের মতো যারা অন্যের শ্রম ও ব্র্যান্ডের নাম চুরি করে বড় হতে চায়, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। এভাবেই চুয়াডাঙ্গার বাজারগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ