দর্শনায় হাঁস-মুরগি চুরির দায়ে স্বামী-স্ত্রীসহ ৩ জনের জেল: গ্রামবাসীর হাতে ধরা খেলেন চোরেরা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মোঃ মিনারুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা: চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার চাকুলিয়া গ্রামে এক অদ্ভুত চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অভাবের তাড়না নাকি স্বভাবের দোষ তা নিয়ে তর্ক থাকলেও, শেষ পর্যন্ত হাঁস-মুরগি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে শ্রীঘরে ঠাঁই হয়েছে এক দম্পতির। তাদের সাথে চুরির সহযোগী হিসেবে আরও এক নারীকে জেল খাটতে হচ্ছে। গত রবিবার (৫ জুলাই ২০২৬) চুয়াডাঙ্গার আদালত এই তিন চোরকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। চুরির মতো অপরাধ নির্মূলে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ এখন জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে, যার ফলে বড় চুরির পাশাপাশি ছোটখাটো এই অপরাধগুলোও আইনের আওতায় আসছে।

ঘটনার শুরু গত ৪ জুলাই শনিবার সকালে। দর্শনা থানার চাকুলিয়া গ্রামের মাঝপাড়ার বাসিন্দা মোফাজ্জল হোসেন তখন তার বাড়ির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তার বাড়ির আঙিনায় পালন করা দেশি হাঁস ও মুরগিগুলো তখন মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এই সুযোগটি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন একদল চোর। অত্যন্ত কৌশলে মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে প্রবেশ করেন তিন ব্যক্তি। তারা একে একে কয়েকটি হাঁস ও মুরগি ধরে খাঁচায় বা ব্যাগে ভরার চেষ্টা করেন। গ্রামের বাড়িতে একটি দেশি মুরগির দাম বর্তমানে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। অর্থাৎ, মাত্র ১০টি মুরগি চুরি করতে পারলে ৫০০০ থেকে ৭০০০ টাকার ধাক্কা। ডলারে হিসাব করলে যা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ডলারের ($৬০) সমান। এই লোভে পড়েই আসামিরা হানা দিয়েছিলেন কৃষকের বাড়িতে।

তবে চোরদের কপাল ছিল মন্দ। মোফাজ্জল হোসেন এবং তার প্রতিবেশীরা চোরদের সন্দেহজনক চলাফেরা টের পেয়ে যান। তারা বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলেন এবং কোনো পালানোর সুযোগ না দিয়েই হাতেনাতে তিনজনকে ধরে ফেলেন। স্থানীয় জনতা তখন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেও তারা আইন হাতে তুলে নেননি। বরং মানবিকতা দেখিয়ে তাদের আটকে রেখে তাৎক্ষণিকভাবে দর্শনা থানায় খবর দেন। গ্রামবাসীর এমন সচেতনতাকে ১০০% ইতিবাচক হিসেবে দেখছে পুলিশ প্রশাসন। খবর পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তৌহিদুল রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং আসামিদের নিজেদের হেফাজতে নেয়।

পুলিশের হাতে ধরা পড়া তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন দর্শনা মোহাম্মদপুর মেথরপট্টি এলাকার মৃত দিলীপ কুমার দাসের ছেলে শ্রী সুজন কুমার দাস (৫০), তার স্ত্রী ময়না রানী (৩৬) এবং তাদেরই প্রতিবেশী মৃত নবীছদ্দিনের স্ত্রী রেখা খাতুন (৫৮)। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন যে, তারা এর আগেও কয়েকবার এভাবে হাঁস-মুরগি ও ছোটখাটো জিনিস চুরি করেছেন। তাদের এই দলবদ্ধ চুরির কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, তাদের পালের হাঁস-মুরগি প্রায়ই রহস্যজনকভাবে ১০% থেকে ১৫% কমে যেত, কিন্তু তারা চোর ধরতে পারতেন না।

পুলিশ আটকের পরপরই তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে চুয়াডাঙ্গার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করে। রবিবার আদালতের শুনানির সময় বিচারক আসামিদের জবানবন্দি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করেন। চুরির মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সুজন কুমার দাসকে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে, তার স্ত্রী ময়না রানী এবং সহযোগী রেখা খাতুনকে ১৫ দিন করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন বিচারক। আদালতের এই রায় শোনার পর সাজাপ্রাপ্তরা কান্নায় ভেঙে পড়লেও বিচারক স্পষ্ট করে দেন যে, ছোট চুরিই একসময় বড় অপরাধের পথে নিয়ে যায়।

দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন, “মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদ চুরি করা একটি সামাজিক ব্যাধি। আমরা নিয়মিত টহল জোরদার করেছি যাতে রাতে বা দিনে কোথাও চুরির ঘটনা না ঘটে। চাকুলিয়া গ্রামের মানুষ যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আমাদের জানিয়েছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।” তিনি আরও জানান, বর্তমানে দর্শনা এলাকায় অপরাধের হার গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০% হ্রাস পেয়েছে এবং জনগণের সহযোগিতা থাকলে এটি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব।

গ্রামের প্রান্তিক মানুষের কাছে হাঁস-মুরগি হলো তাদের ছোট একটি ব্যাংক বা জমানো পুঁজি। বিপদের সময় একটি মুরগি বিক্রি করে তারা হয়তো ওষুধ কেনেন বা সন্তানের স্কুলের খরচ দেন। তাই এই ক্ষুদ্র চুরির সাজা হলেও গ্রামবাসী খুশি। চাকুলিয়া গ্রামের বাসিন্দারা মনে করেন, এই সাজার মাধ্যমে এলাকায় একটি বার্তা যাবে যে, অপরাধ ছোট হোক বা বড়—আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশের তথ্যমতে, বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং রাত্রীকালীন পাহারার ব্যবস্থা করায় চুরির ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমেছে।

আসামিদের বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, অভাব থাকলেও সৎ পথে চলাই মানুষের ধর্ম হওয়া উচিত। স্বামী-স্ত্রী মিলে চুরির মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হওয়া সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের একটি চিত্র। তবে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং পুলিশের সময়োপযোগী তৎপরতা এই ধরনের সামাজিক ব্যাধি দূর করতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দর্শনা থানার পুলিশ জানিয়েছে, তারা এলাকাটিকে ১০০% অপরাধমুক্ত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ