চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা পর হাসেম মণ্ডল (৫২) নামের এক সাধারণ কৃষকের নিথর দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ ২৪ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার হারদী ইউনিয়নের উসমানপুর গ্রামের কাটাখালী মাঠের একটি পাটখেত থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হাসেম মণ্ডল ওই গ্রামের মৃত রুস্তম মণ্ডলের ছেলে ছিলেন। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একজন মেহনতি মানুষের এমন করুণ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর প্রতিবেশী ও স্বজনেরা।
ঘটনার শুরু হয় গত বৃহস্পতিবার সকালে। হাসেম মণ্ডল প্রতিদিনের মতো নিজের কৃষিজমিতে সার প্রয়োগ করার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। কিন্তু বেলা গড়িয়ে দুপুর আর দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো হদিস পাননি। সারা রাত দুশ্চিন্তায় কাটে পরিবারের মানুষের। তারা ভেবেছিলেন হয়তো কোনো আত্মীয়র বাড়িতে গেছেন, কিন্তু কোথাও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের ১০০% মানুষই তখন চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন। আজ শুক্রবার সকালে স্থানীয় কয়েকজন কৃষক যখন মাঠে কাজ করতে যাচ্ছিলেন, তখন কাটাখালী মাঠের নির্জন এক পাটখেতের ভেতর একটি দেহ পড়ে থাকতে দেখে তারা আঁতকে ওঠেন। কাছে গিয়ে তারা চিনতে পারেন এটি নিখোঁজ হাসেম মণ্ডলের দেহ।
খবরটি দাবানলের মতো গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ মাঠে ভিড় জমাতে শুরু করে। স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে আলমডাঙ্গা থানায় খবর দিলে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ দেহটি উদ্ধার করে প্রাথমিক সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। হাসেম মণ্ডলের ছোট ছেলে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “বাবা শুধু সার দিতে মাঠে গিয়েছিলেন, কারো সাথে তাঁর কোনো শত্রুতা ছিল না। কেন এমন হলো আমরা বুঝতে পারছি না।” এলাকায় হাসেম মণ্ডল একজন শান্ত প্রকৃতির মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাই তাঁর এই রহস্যময় মৃত্যুতে গ্রামবাসী হতবাক হয়ে গেছেন।
আলমডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বানী ইসরাইল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ পাঠিয়েছি। নিহতের শরীরে বাইরে থেকে বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন প্রাথমিকভাবে দেখা যায়নি। তবে মৃত্যুর আসল কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে।” তিনি আরও জানান যে, এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ ১০/১০ ভাগ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করছে যাতে কোনো প্রকার অপরাধমূলক কাজ হয়ে থাকলে তা বের করা যায়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
চুয়াডাঙ্গা জেলায় কৃষিকাজই মানুষের প্রধান জীবিকা। হাসেম মণ্ডলের মতো কৃষকেরা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জমিতে কাজ করেন। বর্তমান বাজারে সার ও কীটনাশকের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে একজন কৃষকের সংসার চালানো এমনিতেই কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় এক কৃষকের মতে, গত বছরের তুলনায় সারের দাম প্রায় ১৫% থেকে ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই কষ্টের ফসলের দেখাশোনা করতে গিয়েই হাসেম মণ্ডলকে প্রাণ হারাতে হলো কি না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে একজন কৃষকের মৃত্যু মানে কেবল একটি প্রাণের বিনাশ নয়, বরং একটি পরিবারের পুরো আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়া। হাসেম মণ্ডলের জমির ফসলের বাজার মূল্য প্রায় ১০,০০০ টাকার মতো হবে, কিন্তু তাঁর জীবনের মূল্য অপরিসীম।
গ্রামের মানুষ এখন মাঠ-ঘাটে একা চলাফেরা করতে ভয় পাচ্ছেন। উসমানপুর গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, ইদানীং এলাকায় অপরিচিত মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। তারা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে মাঠের নির্জন এলাকাগুলোতে টহল পুলিশের উপস্থিতি ১০% বাড়ানো হলে কৃষকেরা নির্ভয়ে কাজ করতে পারবেন। হাসেম মণ্ডলের পরিবার এখন বিচারের আশায় দিন গুনছে। তারা চান পুলিশ যেন দ্রুত এই রহস্যের জট খোলে। আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসেবে বাংলাদেশের একজন কৃষকের মাসিক আয় হয়তো ১০০ ডলারের ($) আশেপাশে হতে পারে, কিন্তু সেই সামান্য উপার্জনের জন্য জীবন দিতে হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
ময়নাতদন্ত শেষ করে আজ বিকেলের দিকে হাসেম মণ্ডলের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। চুয়াডাঙ্গার এই প্রান্তিক জনপদে এমন অপমৃত্যুর ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেটাই সবার চাওয়া। আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই এলাকার শান্তি বজায় রাখতে সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে। গ্রামের সচেতন মানুষগুলো এখন হাসেম মণ্ডলের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন। তবে সবার মনেই এখন একটিই প্রশ্ন কীভাবে হাসেম মণ্ডলের মৃত্যু হলো? এটি কি কোনো দুর্ঘটনা নাকি কোনো গোপন শত্রুতার বলি? উত্তরটি এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ওপর ঝুলে আছে।
পরিশেষে বলা যায়, চুয়াডাঙ্গার উসমানপুর গ্রামের এই করুণ ঘটনাটি আমাদের গ্রামীণ নিরাপত্তার অভাবকে আবারও সামনে এনেছে। হাসেম মণ্ডলের নিথর দেহ উদ্ধার হওয়ার পর থেকে তাঁর বাড়ির রান্নাঘরে আগুন জ্বলেনি। নিহতের স্ত্রী ও সন্তানদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারই পারে তাঁদের মনে কিছুটা সান্ত্বনা দিতে। চুয়াডাঙ্গার প্রশাসন ও পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের অনুরোধ, তারা যেন বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখেন। আজকের এই রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে কাটাখালী মাঠের সেই নিস্তব্ধতা যেন হাসেম মণ্ডলের বিদেহী আত্মার জন্য শোক পালন করছিল।
















