ড্যুটির কল শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিজের ছেলের লাশ দেখলেন পুলিশ সদস্য: কিশোরগঞ্জে শোকের মাতম

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের আকাশটা আজ যেন একটু বেশিই ধূসর হয়ে উঠেছিল পুলিশ সদস্য শামসুল হকের জন্য। প্রতিদিনের মতো সকালেই তৈরি হয়ে থানায় হাজির হয়েছিলেন তিনি। সদর মডেল থানার গাড়িচালক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল টহল পুলিশকে দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছে দেওয়া। আজ শুক্রবার সকাল ১০:৩০ মিনিটের দিকে হঠাৎ ওসির ফোন আসে। জানানো হয়, সার্কিট হাউসের কাছে জনতা স্কুল রোড এলাকায় একটি বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। শামসুল হক কোনো কিছু না ভেবেই গাড়ি নিয়ে সহকর্মীদের নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছে যান। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে যা দেখলেন, তার জন্য তিনি বা পৃথিবীর কোনো বাবা কোনোদিন প্রস্তুত থাকেন না। রাস্তার ওপর পড়ে থাকা রক্তাক্ত নিথর দেহটি ছিল তাঁরই মেজ সন্তান, ১০ বছরের মোহাম্মদ তুহিনের।

ছেলের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শামসুল হকের সেই আর্তনাদ আজ পুরো কিশোরগঞ্জবাসীর হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। তিনি ডুকরে কেঁদে বলছিলেন, ‘ওসির নির্দেশে আমি তো এসেছি দায়িত্ব পালন করতে। আমি জানতাম না এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই আমাকে নিজের কলিজার টুকরার এমন করুণ মৃত্যু দেখতে হবে। টহল পুলিশ নিয়ে যখন ঘটনাস্থলে নামলাম, আমার চোখ যেন বিশ্বাস করতে চাইছিল না। কে জানত আমার আদরের মেজ ছেলেটা সাইকেল নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে এভাবে চলে যাবে?’ এই বুকফাটা কষ্ট তিনি কাউকে বলে বোঝাতে পারছেন না। তুহিন গাইটাল জনতা স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল মেজ। কিশোরগঞ্জে তারা ভাড়া বাসায় থাকলেও তাদের আদি বাড়ি নেত্রকোনা জেলায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সকালে তুহিন তার ছোট সাইকেলটি নিয়ে বাসা থেকে ঘুরতে বেরিয়েছিল। জনতা স্কুল রোড এলাকায় আসার পর বিপরীত দিক থেকে আসা একটি সিমেন্টবোঝাই ট্রাক তাকে চাপা দেয়। ট্রাকটি বেশ দ্রুতগতিতে আসছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সিমেন্টের বস্তায় ঠাসা সেই বিশাল ট্রাকের তলায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় শিশুটি। পুলিশ জানায়, ট্রাকে প্রায় ৫,০০০ ডলারের ($) বেশি মূল্যের সিমেন্ট বোঝাই করা ছিল। দুর্ঘটনার পর ট্রাকের ওজন ও গতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশে গত এক বছরে কিশোর-কিশোরীদের সড়ক দুর্ঘটনার হার প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার বেশিরভাগই ঘটে বেপরোয়া ট্রাক বা বাসের কারণে। আজকের এই ঘটনাই যেন সেই পরিসংখ্যানের এক রক্তাক্ত উদাহরণ।

সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফজলে রাব্বি এই টহল দলের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তো অনেক দুর্ঘটনাই সামাল দিই, কিন্তু আজকের পরিস্থিতি ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। আমাদের গাড়ির চালক শামসুল ভাই যখন দেখলেন ভিকটিম তাঁর নিজের ছেলে, তখন আমরা সবাই পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা বা ১০/১০ ভাগ সঠিক শব্দ আমাদের কাছে ছিল না। সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষও এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।’ পুলিশের এই টিমের কাজ ছিল লাশ উদ্ধার করা, কিন্তু সহকর্মীর সন্তানের লাশ তোলা ছিল তাঁদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন ডিউটি।

কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল কালাম ভূঞা জানিয়েছেন, ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক ঘটনার সাথে সাথেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। চালককে ধরার জন্য পুলিশ এখন ১০০% তৎপরতা চালাচ্ছে। ট্রাক চালকদের লাইসেন্স এবং ফিটনেস নিয়ে ইদানীং নানা বিতর্ক থাকলেও মহাসড়কের পাশের এই জনপদগুলোতে দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ শহরে গত ছয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার পূর্বের তুলনায় ১০% বেড়েছে। জনতা স্কুল রোড এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে ভারী যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি ছিল বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

নিহত তুহিনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। আইনি প্রক্রিয়া শেষে জুমার নামাজের পর কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইনসে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সহকর্মীরা চোখের জলে বিদায় জানান খুদে তুহিনকে। এরপর মরদেহটি নিয়ে যাওয়া হয় নেত্রকোনা সদরে তাদের গ্রামের বাড়িতে। সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে মাটির নিচে পরম শান্তিতে শুইয়ে দেওয়া হয় তাকে। শামসুল হকের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। স্ত্রী ও অন্য দুই সন্তানকে কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছে না। সংসারের যে হাসি-খুশি ছেলেটি সকালে সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিল, সে ফিরল একটি খাটিয়ায় চড়ে, যা এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে।

সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা বলছেন, হাইওয়ে রোডের পাশে স্কুল বা আবাসিক এলাকা থাকলে সেখানে যানবাহনের গতি ৪০% কমিয়ে আনা উচিত। বিশেষ করে সিমেন্ট বা রডবোঝাই ট্রাকগুলো অনেক সময় ওভারলোডিংয়ের কারণে সময়মতো ব্রেক করতে পারে না। আজকের এই ঘটনায় শুধু একটি জীবন ঝরে যায়নি, বরং একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। শামসুল হকের মতো যারা দিনরাত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করেন, তাদের নিজের পরিবারই যখন এমন অনিরাপত্তার শিকার হয়, তখন পুরো সিস্টেম নিয়েই নতুন করে ভাবার সময় আসে।

পরিশেষে, এই করুণ মৃত্যু আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে সড়ক নিরাপত্তা কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং চালকদের সচেতনতা না বাড়লে আরও কত শামসুল হককে ডিউটির কল শুনে নিজের সন্তানের লাশের পাশে দাঁড়াতে হবে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ট্রাকের সেই পলাতক চালককে দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী ও পুলিশ পরিবার। তুহিনের সেই ছোট নীল সাইকেলটি আজ জনতা স্কুল রোডের একপাশে পড়ে ছিল, যা আমাদের নিরাপদ সড়কের দাবীকে আরও জোরালো করে দিয়ে গেল।

সম্পর্কিত নিবন্ধ