পাহাড়ে মানবিকতার প্রতিচ্ছবি: পানি-কাদা মাড়িয়ে বন্যার্তদের দুয়ারে ৭ বিজিবি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email


খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি। এমন চরম বিপদের দিনে সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণের অপেক্ষায় না থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা নিজেরাই কাঁধে করে ত্রাণ নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন দুর্গম এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে। গত সোমবার বিকেলে উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় বাবুছড়া ব্যাটালিয়ন (৭ বিজিবি)-এর সদস্যদের এই মানবিক তৎপরতা স্থানীয়দের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে।

টানা ৫ থেকে ৬ দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে মেরুং ইউনিয়নের প্রায় ৮০% (আশি শতাংশ) এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে অনেক কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েক হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে বেতছড়ি, পাক্কুজ্যছড়া, লক্ষ্মী কার্বারীপাড়া এবং চিটাগাংপাড়ার মতো এলাকাগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। চারদিকে অথৈ পানি আর কাদা এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বাইরে বের হওয়া বা বাজার করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে পড়া এই মানুষগুলোর কাছে দেবদূতের মতো হাজির হন বিজিবি সদস্যরা।

বাবুছড়া ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ইফতিয়াক আহাম্মদ ইবনে রিয়াজ নিজেই এই ত্রাণ কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন। তিনি কোনো আভিজাত্য বা আনুষ্ঠানিকতার তোয়াক্কা না করে সাধারণ সৈনিকদের মতোই হাটু সমান পানি ও হাঁটু অবধি কাদা মাড়িয়ে দুর্গতদের বাড়ির আঙিনায় গিয়ে হাজির হন। বিজিবির এই দলটি চাল, ডাল, তেল, আলুসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেটগুলো প্রতিটি পরিবারের হাতে তুলে দেন। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫০০ (পাঁচশত) এর বেশি পরিবারকে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে এবং এই সহায়তার বাজারমূল্য প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা।

ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি বন্যাদুর্গতদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে পানিবাহিত রোগ। বন্যার পানি নামতে শুরু করলেই ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও জ্বরের প্রকোপ ১০০% (শতভাগ) বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিজিবি একটি বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ব্যাটালিয়নের মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন এম. আবদুল্লাহ আল-মামুন নিজে অসুস্থ রোগীদের পরীক্ষা করছেন। সেখানে বৃদ্ধ ও শিশুদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিজিবির পক্ষ থেকে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে এবং বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় যেখানে ভালো কোনো হাসপাতাল নেই, সেখানে বিজিবির এই চিকিৎসা সহায়তা মানুষের প্রাণ বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখছে।

পাক্কুজ্যছড়া এলাকার ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, “চারদিন ধরে চুলার ওপর পানি ছিল, ঠিকমতো খেতে পারিনি। রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসেনি। বিজিবির সাহেবরা যেভাবে কাদা ভেঙে এসে আমাদের খাবার দিয়ে গেলেন, তা কখনো ভুলব না।” স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এবার বন্যার ভয়াবহতা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। প্রায় ৯৬ ঘণ্টা ধরে তারা পানির সাথে যুদ্ধ করছেন। এমন সময়ে বিজিবির পক্ষ থেকে পাওয়া এই ১,০০০ (এক হাজার) বা ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকার সহায়তাও তাদের কাছে অমূল্য মনে হচ্ছে।

সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইমরান হোসেনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই কার্যক্রমে বিজিবির সদস্যরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিটি মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেন। কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা ছাড়াই এই বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। দুর্গম পাহাড়ের সরু পথ আর পানির স্রোত পার হয়ে বিজিবি সদস্যদের এই পথচলা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু দেশের সেবায় নিয়োজিত এই বাহিনীর কাছে কোনো বাধাই বড় হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তারা প্রমাণ করেছেন যে, সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি আর্তমানবতার সেবায় বিজিবি সব সময় প্রস্তুত।

অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ইফতিয়াক আহাম্মদ ইবনে রিয়াজ গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, বিজিবি জনগণের বাহিনী। তারা শুধু সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীই নন, বরং যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাদের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখেছি দুর্গম এলাকার মানুষগুলো কতটা কষ্টের মধ্যে আছেন। আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস যদি তাদের মুখে সামান্য হাসি ফোটাতে পারে, তবেই আমাদের সার্থকতা। যতদিন না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে, ততদিন বাবুছড়া ব্যাটালিয়ন (৭ বিজিবি) তাদের সাধ্যমতো সহায়তা চালিয়ে যাবে।”

বর্তমানে দীঘিনালার বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও মানুষের ভোগান্তি এখনো কমেনি। ঘরবাড়িতে জমে থাকা কাদা পরিষ্কার করা এবং নতুন করে জীবন শুরু করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি বিজিবির এই অব্যাহত সহায়তা বন্যার্তদের মনোবল চাঙ্গা রাখছে। দীঘিনালার মানুষ আশা করছেন, বিজিবির মতো অন্যান্য সংস্থা ও বিত্তবানরা যদি এভাবে এগিয়ে আসেন, তবে এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা অনেক সহজ হবে। পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত এই জনপদ আবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

সম্পর্কিত নিবন্ধ