শুক্রবার গভীর রাত। রাজধানীর কাঁটাবন এলাকার মানুষ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঠিক এমন সময়ই হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় একটি ১৪ তলা আবাসিক ভবন। চারদিকে শুধু মানুষের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার আর সাইরেনের শব্দ। কাঁটাবন এলাকার এই ১৪ তলা আবাসিক ভবনের ১২ তলার দুটি ফ্ল্যাটে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় আগুনে দগ্ধ হয়ে দুজন তরুণ মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। রাতের অন্ধকারে এমন ভয়াবহ আগুনের খবরে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে ওই ভবনের ১২ তলায় প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা খুব দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। আগুনের ভয়াবহতা বেশি থাকায় একে একে ফায়ার সার্ভিসের মোট ৬টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রায় এক ঘণ্টার একটানা ও নিরলস চেষ্টায় রাত ৩টা ৮ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তাদের দ্রুত পদক্ষেপের কারণেই আগুন ভবনের অন্য তলাগুলোতে ছড়াতে পারেনি।
এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে যে দুজন তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতরা হলেন ২৫ বছর বয়সী মো. জনি এবং ১৯ বছর বয়সী মো. আব্দুস সালাম। তারা দুজনই ওই ভবনে কাজ করতেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাফি আল ফারুক জানান, আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনের ভেতর থেকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও দগ্ধ অবস্থায় ওই দুই যুবককে উদ্ধার করেন। তাদের শরীরের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% অংশ আগুনে পুড়ে গিয়েছিল।
উদ্ধারের পরপরই তাদের জীবন বাঁচাতে দ্রুত দুটি আলাদা হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর মধ্যে মো. জনিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এবং মো. আব্দুস সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাদের দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। এই দুই তরুণের অকাল মৃত্যুতে তাদের পরিবারে এখন চরম শোকের মাতম চলছে। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় এসে এভাবে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়ার ঘটনা সত্যিই খুব হৃদয়বিদারক।
আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে বহুতল ভবনগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা শহরের প্রায় ৬০% আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা ফায়ার সেফটি সিস্টেম নেই। অনেক ভবনে ইমারজেন্সি এক্সিট বা জরুরি বের হওয়ার সিঁড়ি থাকলেও সেখানে তালা মারা থাকে অথবা মালামাল রেখে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়। ফলে আগুন লাগলে সাধারণ মানুষ সহজে বের হতে পারেন না এবং ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে বা আগুনে পুড়ে মারা যান।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তারা ভবনের প্রতিটি ফ্লোর এবং ফ্ল্যাট খুব ভালোভাবে তল্লাশি করে দেখেছেন। বর্তমানে ভবনের ভেতরে আর কোনো মানুষ আটকে নেই এবং নতুন করে অন্য কোনো হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি। তবে ঠিক কী কারণে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখনো ১০০% নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, গ্যাসের চুলা নাকি অন্য কোনো কারণে এই আগুন লেগেছে, তা ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞ দলের তদন্তের পরই পরিষ্কারভাবে জানা যাবে।
এই ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস আবারো সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছে। তারা বহুতল ভবনের মালিকদের ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সেফটি নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছেন। প্রতিটি ভবনে ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা আগুন নেভানোর যন্ত্র রাখা এবং তা ব্যবহারের নিয়ম সবাইকে শিখিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। একটু সচেতনতা ও সাবধানতাই পারে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে এবং মানুষের মূল্যবান জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে।
















