নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার পৌর এলাকায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। মহামান্য হাইকোর্টের সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার কড়া নির্দেশ অমান্য করে এক বিরোধপূর্ণ জমিতে জোরপূর্বক পাকা স্থাপনা নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ উঠেছে লোহাগড়া পৌর এলাকার ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুবাস চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, এই ঘটনার মূল বাদী হলেন একই এলাকার বাসিন্দা বিবেকানন্দ দাস। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে অমান্য করার কারণে এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আইনের শাসন ও আদালতের প্রতি সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
ঘটনার সূত্রপাত একটি বিশাল জমির মালিকানা নিয়ে। বাদী বিবেকানন্দ দাস স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে পুরো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, লোহাগড়া পৌর এলাকার ৯৬ নং কচুবাড়িয়া মৌজায় বিবাদী সুবাস চন্দ্র দাসের সাথে তার একটি দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই চলছে। এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মোট ৩৫টি দাগে থাকা প্রায় ৫ একর ৯৬ শতাংশ বিশাল একটি জমি। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী এই বিশাল জমির দাম কয়েক কোটি টাকা বা কয়েক লাখ ডলারের ($) সমান। এই জমির মালিকানা নিয়ে ১৯৮৯ সালের একটি পুরোনো ডিগ্রি এবং গত ২৯ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে নিম্ন আদালতের দেওয়া একটি রায়ের (০৭/২০২৪) বিরুদ্ধে বিবেকানন্দ দাস মহামান্য হাইকোর্টে আপিল করেন।
বিবেকানন্দ দাস নিম্ন আদালতের ওই রায় বাতিল চেয়ে গত ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি এস. এম. কুদ্দুস জামানের আদালতে একটি মামলা (মামলা নং ২৭৯৮) দায়ের করেন। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি এই মামলার প্রাথমিক আদেশে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ‘রুলের শুনানি চলাকালীন এবং রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষকেই মামলার ওই বিতর্কিত জমির দখল ও বর্তমান অবস্থানের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।’ অর্থাৎ, আদালত চূড়ান্ত রায় না দেওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে কেউ কোনো নতুন নির্মাণকাজ বা পরিবর্তন করতে পারবেন না। আদেশের কপি বাদী ও বিবাদী উভয়কেই ডাকযোগে পাঠানোর নির্দেশও দেন আদালত।
কিন্তু আদালতের এমন কড়া নির্দেশ থাকার পরও বিবাদী সুবাস চন্দ্র দাস তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাদী বিবেকানন্দ দাসের অভিযোগ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল ঠিক ৮টার দিকে সুবাস চন্দ্র দাস আর.এস ১২৩৭ নম্বর বিবাদমান দাগের ২০ শতাংশ জমির ওপর জোরপূর্বক পাকা দালানঘর এবং একটি অগভীর নলকূপ বা টিউবওয়েল স্থাপনের কাজ শুরু করেন। এই বিশাল নির্মাণকাজ করতে গিয়ে তিনি রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিকদের কাজে লাগিয়েছেন, যার পেছনে ইতিমধ্যে কয়েক লাখ টাকা বা কয়েক হাজার ডলার ($) খরচ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিবাদী যখন এই নির্মাণকাজ শুরু করেন, তখন বাদী বিবেকানন্দ দাস সেখানে উপস্থিত হন। তিনি সুবাস চন্দ্র দাসকে মহামান্য হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অত্যন্ত বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দেন এবং নির্মাণকাজ বন্ধ করার অনুরোধ করেন। কিন্তু সুবাস চন্দ্র দাস তার কথায় কোনো কান না দিয়ে বরং জোরপূর্বক এবং পেশিশক্তি খাটিয়ে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখেন। বিবেকানন্দ দাস জানান, তিনি এই মুহূর্তে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও এভাবে জমি দখল হতে দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। সমাজে আইনের শাসন না থাকলে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে বিচার চাইবে, সেই প্রশ্নও তিনি তুলেছেন।
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত সুবাস চন্দ্র দাস সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কথা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন যে, মহামান্য হাইকোর্টের এমন কোনো নিষেধাজ্ঞার বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশের বিষয়টি তার একেবারেই জানা নেই। তিনি বলেন, “আমি আমার নিজের জায়গাতেই ঘর তুলছি। আদালত থেকে কোনো নোটিশ বা চিঠি আমি হাতে পাইনি।” তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ না জানার অজুহাত দিয়ে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে এখনই এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে এভাবে জোরপূর্বক স্থাপনা নির্মাণ করতে দিলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যাবে। বিবেকানন্দ দাস এখন স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এই অবৈধ নির্মাণকাজ দ্রুত বন্ধ করার এবং হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। পুরো লোহাগড়া উপজেলাবাসী এখন তাকিয়ে আছে প্রশাসন এই বিষয়ে কী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তার দিকে।
















