রাজনীতিতে মানুষের আদর্শ আর আবেগের অনেক দাম থাকে। কিন্তু যখন সেই রাজনীতির নোংরা খেলায় নিজের রক্ত বা আপনজন প্রাণ হারায়, তখন মানুষের সব বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ঠিক এমনই এক মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নে। নিজের আপন ফুফাতো ভাই ও ছাত্রশিবিরের নেতা সাইফুল্লাহ বারী খুনের প্রতিবাদে এক অভিনব কাণ্ড ঘটিয়েছেন তোতা মিয়া নামের এক বিএনপি কর্মী। নিজ দলের নেতাদের হাতে ভাইয়ের এমন নির্মম মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে না পেরে তিনি প্রকাশ্য দিবালোকে দুধ দিয়ে গোসল করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে পাকাপাকিভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তার এই প্রতীকী প্রতিবাদ ও রাজনীতি ছাড়ার ঘটনা এখন পুরো এলাকায় মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তোতা মিয়া কোনো সাধারণ সমর্থক ছিলেন না। তিনি দীর্ঘ প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে বোনারপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির রাজনীতির সাথে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। দলের প্রতিটি মিটিং-মিছিল আর কর্মসূচিতে তিনি সবসময় সামনের সারিতে থাকতেন। কিন্তু গত ২১ জুন তার জীবনে এক ভয়ংকর ঝড় নেমে আসে। ওই দিন প্রকাশ্য দিবালোকে তার আপন ফুফাতো ভাই এবং বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ বারীকে অত্যন্ত নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। চোখের সামনে ভাইয়ের এমন রক্তাক্ত মৃত্যু তোতা মিয়াকে মানসিকভাবে ১০০% ভেঙে দেয়।
তোতা মিয়ার এই ক্ষোভের প্রধান কারণ হলো, এই নৃশংস হত্যা মামলায় স্থানীয় যুবদল ও বিএনপির বেশ কয়েকজন পরিচিত নেতাকর্মীর নাম সরাসরি উঠে আসে। একটি স্কুল পরিচালনা কমিটির সামান্য দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নিজের দলের লোকেরাই যখন তার ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করে, তখন তোতা মিয়া চরম হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন, যে দলের জন্য তিনি এত বছর নিজের ঘাম ও সময় দিয়েছেন, সেই দলের নেতারাই আজ তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এমন নোংরা ও রক্তমাখা রাজনীতির সাথে তিনি আর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক রাখবেন না।
অতীতের এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থেকে নিজেকে ‘পবিত্র’ বা ‘মুক্ত’ করার জন্যই মূলত তিনি দুধ দিয়ে গোসল করার এই ব্যতিক্রমী ও প্রতীকী প্রতিবাদের পথ বেছে নেন। ঘটনার দিন দুপুরে তোতা মিয়া এক বালতি দুধ নিয়ে সবার সামনে হাজির হন। দুধ দিয়ে গোসল করার সময় স্থানীয় শত শত উৎসুক জনতা সেখানে ভিড় জমায়। সবার সামনেই তিনি বালতি থেকে দুধ মাথায় ঢেলে নিজেকে পবিত্র করেন। এই অভিনব দৃশ্য দেখতে গ্রামের নারী-পুরুষ সবাই সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। অনেকেই তার এই সাহসী সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন, আবার অনেকেই রাজনীতির এমন নিষ্ঠুর রূপ দেখে আক্ষেপ করেছেন।
দুধ দিয়ে গোসল করার পর ভেজা শরীরেই তোতা মিয়া উপস্থিত জনতার সামনে এক আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, আজ থেকে তিনি আর কখনো বিএনপির রাজনীতির ছায়াও মাড়াবেন না। এখন থেকে তিনি সম্পূর্ণ সাধারণ একজন নাগরিক বা কৃষক হিসেবে নিজের পরিবার নিয়ে শান্তিতে জীবনযাপন করবেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে রাজনীতি মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, সেই রাজনীতির আমার কোনো দরকার নেই।” একইসাথে তিনি তার ফুফাতো ভাই সাইফুল্লাহ বারী হত্যার সাথে জড়িত সকল আসামির দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান।
রাজনীতি ছাড়ার এই অভিনব দৃশ্য শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেখানে উপস্থিত অনেকেই মোবাইল ফোনে এই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন এবং তা মুহূর্তের মধ্যেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দেখে দেশের নানা প্রান্তের মানুষ মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। কেউ কেউ বলছেন, তোতা মিয়া দলের প্রতি এক চরম চপেটাঘাত করে গেছেন। আবার সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আমাদের দেশের রাজনীতি এখন এতটাই সহিংস হয়ে উঠেছে যে, সাধারণ মানুষ বা কর্মীরা এখন আর এখানে নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না।
একটি রাজনৈতিক দল তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার তৃণমূলের কর্মীরা ভালো থাকেন। কিন্তু তোতা মিয়ার মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর এমন হতাশা প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। এখন দেখার বিষয়, সাইফুল্লাহ বারী হত্যার ঘটনায় প্রশাসন কতটা দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং তোতা মিয়ার এই অভিনব প্রতিবাদ স্থানীয় রাজনীতিতে কোনো নতুন বার্তা দিতে পারে কি না।
















