১০৪ বছরের একাকী লড়াই: একমুঠো খাবারের আশায় দিন কাটে হাফিজ উদ্দিনের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মানুষের জীবন স্বপ্নে আর সম্ভাবনায় ভরা থাকে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় সেই স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে যায়। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর পৌরসভার বাকরেরহাট এলাকার বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন ঠিক তেমনই এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। তার বয়স এখন ১০৪ বছর। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে তিনি চরম দারিদ্র্য, নিঃসঙ্গতা আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করছেন। আবাদি জমির ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জরাজীর্ণ ভাঙাচোরা টিনের ঘরই এখন তার শেষ আশ্রয়স্থল।

তার এই ভাঙা ঘরে কোনো বিদ্যুতের আলো পৌঁছায় না। রাতে তাকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে সময় কাটাতে হয়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ১০৪ বছর বয়সী এই বৃদ্ধের ব্যবহারের জন্য কোনো শৌচাগার বা টয়লেট নেই। ঘরে যাওয়ার জন্য নেই কোনো হাঁটার রাস্তাও। বার্ধক্যের ভারে তার শরীর পুরোপুরি নুয়ে পড়েছে। শারীরিকভাবে তিনি এতটাই দুর্বল যে নিজে থেকে এক কদমও হাঁটতে পারেন না। এখন তার বেঁচে থাকাটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে আশপাশের প্রতিবেশীদের দয়া আর সহানুভূতির ওপর। প্রতিবেশীরা দয়া করে খাবার দিলে তিনি পেট ভরে খান, আর না দিলে দিনের পর দিন তাকে উপোস করেই কাটাতে হয়।

স্থানীয় বয়স্ক মানুষজন জানান, ১৯২২ সালের ১১ জুলাই হাফিজ উদ্দিন জন্মগ্রহণ করেন। যৌবনে তিনি এলাকার একজন বেশ সচ্ছল ও কর্মঠ কৃষক ছিলেন। স্ত্রী এবং এক মেয়েকে নিয়ে তার সুখের একটি সুন্দর সংসার ছিল। কিন্তু তার জীবনে কোনো ছেলেসন্তান ছিল না। আমাদের সমাজের কিছু লোভী মানুষ এই সুযোগটাই কাজে লাগায়। তার নিজের আত্মীয়স্বজনরা অত্যন্ত চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে জালিয়াতি করে তার ১০০% আবাদি জমি ও সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেয়। এক নিমেষেই তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেন। সংসার চালানোর জন্য একসময় তাকে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভিক্ষাও করতে হয়েছে। এত অভাবের মধ্যেও তিনি অনেক কষ্ট করে নিজের একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেন।

আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগের কথা। এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় হাফিজ উদ্দিন মারাত্মকভাবে আহত হন এবং পঙ্গু হয়ে যান। সেই দুর্ঘটনার পর তিনি তার স্বাভাবিক চলাফেরার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন। আর ঠিক সেখান থেকেই তার জীবনে দুঃখের এক নতুন কালো অধ্যায় শুরু হয়। অভাব আর অসুস্থতার এই কঠিন সময়ে তার স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চিরতরে চলে যান। তারপর থেকে একাকিত্ব আর কষ্টই তার জীবনের একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে।

বর্তমানে তিনি সরকার থেকে বয়স্ক ভাতা এবং ভিজিএফের কিছু চাল পান ঠিকই, কিন্তু সেটা তিনি নিয়মিত হাতে পান না। বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অনেক বেশি। সরকার থেকে মাসে হয়তো ৫বা১০(ডলার) সমমূল্যের যে সামান্য ভাতা তিনি পান, তা দিয়ে পুরো মাসের খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানো তার জন্য একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির দিনে তার ঘরের টিনের ফুটো চাল দিয়ে অনবরত পানি পড়ে। আর কালবৈশাখী বা ঝড়ের রাতে ঘর ভেঙে পড়ার আতঙ্কে তাকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়।

প্রতিবেশী সাইদুল ইসলাম এই বৃদ্ধের কষ্ট কাছ থেকে দেখেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “চাচা খুব অসহায় অবস্থায় দিন পার করছেন। কেউ খাবার এনে দিলে তিনি খান, না দিলে তাকে না খেয়েই থাকতে হয়। আমরা এলাকার মানুষজন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু পারি তাকে সহযোগিতা করি। কিন্তু তার জন্য আরও বড় ধরনের স্থায়ী সাহায্য দরকার। ঘরে একটা টয়লেট নেই, কারেন্টের আলো নেই। রাতের বেলা অন্ধকারে মশা আর পোকামাকড়ের কামড় খেয়ে তাকে পড়ে থাকতে হয়।”

হাফিজ উদ্দিন নিজে তার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “আমার বয়স অনেক হয়েছে। শরীর একদম চলে না। ঠিকমতো চলাফেরাও করতে পারি না। কেউ দয়া করে খাবার দিলে খাই, না দিলে উপোস থাকি। আল্লাহ যতদিন আমাকে দুনিয়ায় রাখেন, ততদিন এভাবেই হয়তো চলতে হবে। কেউ যদি আমাকে দয়া করে একটা হুইলচেয়ার কিনে দিত, তাহলে আমার খুব উপকার হতো। অন্তত একটু বাইরে বের হতে পারতাম।”

বিষয়টি উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফের নজরে আনা হলে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বৃদ্ধকে খুব দ্রুত সব ধরনের সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”

স্থানীয় সচেতন মানুষ মনে করেন, ১০৪ বছর বয়সী এই অসহায় বৃদ্ধের জন্য এখন জরুরি ভিত্তিতে একটি নিরাপদ ও পাকা ঘর দরকার। এর পাশাপাশি একটি হুইলচেয়ার, নিয়মিত খাবার এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকারি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষরা যদি তাদের আয়ের সামান্য ১% বা ২% অংশও এই বৃদ্ধের জন্য দান করেন, তবে জীবনের এই শেষ বেলায় তিনি কিছুটা হলেও শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ