একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এই দুটি বিষয়ই চরম হুমকির মুখে পড়েছে। শিশু রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড, দেশজুড়ে লাগামহীন চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রতিবাদে আজ রাজপথে নেমেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। শুক্রবার, ২২ মে দুপুরে সিলেট মহানগর শাখার উদ্যোগে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে সংগঠনটি। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা শতভাগ (১০০%) নিশ্চিত করার দাবিতে সিলেটের রাজপথে এই দিন হাজারো ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ঢল নামে। জুমার নামাজের পর থেকেই সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে জড়ো হতে থাকেন।
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য এবং সিলেট মহানগর সভাপতি শহীদুল ইসলাম সাজু এই বিশাল মিছিলের সামনে থেকে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। আজ দুপুর ঠিক ২টার দিকে নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট থেকে নেতাকর্মীরা এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি জিন্দাবাজারসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়ক প্রদক্ষিণ করে। প্রচণ্ড রোদ ও গরম উপেক্ষা করে মিছিলে অংশগ্রহণকারী তরুণেরা রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও তাদের এই দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে গিয়ে মিছিলটি ঐতিহাসিক চৌহাট্টা পয়েন্টে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।
সম্প্রতি শিশু রামিসাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাটি পুরো দেশের বিবেকবান মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সমাবেশে উপস্থিত ছাত্রনেতারা বলেন, একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে ছোট্ট এক নিষ্পাপ শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু তারা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। শুধু রামিসা নয়, দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিদিন এমন অসংখ্য ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে। অপরাধীরা রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয়ের আড়ালে সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার কারণে সমাজে অপরাধের মাত্রা আগের চেয়ে অন্তত ৩০% থেকে ৪০% বেড়ে গেছে। সাধারণ মানুষ এখন তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে চরম আতঙ্কে দিন পার করেন। নেতারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম ব্যর্থতা ও নীরবতার কঠোর সমালোচনা করেন। তারা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে রামিসার খুনিদের ফাঁসি নিশ্চিত করার জোর দাবি তোলেন।
দেশের বর্তমান চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের ভয়াবহ রূপ নিয়েও সমাবেশে বক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—সবখানেই এখন পেশাদার চাঁদাবাজরা নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা শান্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না। ছোট ব্যবসায়ীদের প্রতিদিনের লাভের প্রায় ২০% থেকে ২৫% টাকা জোর করে কেড়ে নিচ্ছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। বড় বড় শিল্পপতি ও প্রবাসীদের কাছে ফোন করে অনেক সময় মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে দুর্বৃত্তরা। চাঁদা না দিলে তারা সরাসরি হামলা ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে। প্রবাসীরা দেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে দেশের অর্থনীতিতে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রসমাজ সবসময় পাহারাদারের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সব গণ-আন্দোলনে ছাত্রদের অবদান সবচেয়ে বেশি। ছাত্রশিবিরের নেতারা মনে করিয়ে দেন, আজকের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে দেশকে উদ্ধার করতে তরুণদেরই আবার সামনে এগিয়ে আসতে হবে। তারা বলেন, প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই খুন, গুম আর ডাকাতির খবর পাওয়া যায়। পুলিশ প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের ডায়েরি বা মামলা নিতে চায় না। অপরাধের শিকার পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে হতাশ হচ্ছে। একটি শিশু যখন নিজ দেশে নিরাপদ নয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তারা পুরো বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দাবি জানান।
চৌহাট্টা পয়েন্টে আয়োজিত এই সমাবেশের একেবারে শেষ পর্যায়ে সমাপনী বক্তব্য রাখেন সিলেট মহানগর সভাপতি শহীদুল ইসলাম সাজু। তিনি অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে বলেন, যারা শিশু রামিসাকে হত্যা করেছে, প্রশাসনকে দ্রুত তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। পুলিশ প্রশাসন যদি অপরাধীদের ধরতে ব্যর্থ হয়, তবে ছাত্রসমাজ আর চুপ করে ঘরে বসে থাকবে না। তিনি প্রশাসনকে কড়া হুঁশিয়ার করে বলেন, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী চলে। তাই জনগণকে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা দেওয়া তাদের প্রধান দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে জনগণ নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহীদুল ইসলাম সাজু সিলেটের সর্বস্তরের ছাত্র ও সাধারণ জনতাকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সমাজে শান্তি ফেরাতে হলে শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকলে কোনো লাভ হবে না। সাধারণ মানুষকেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভয় ভেঙে শক্ত প্রতিরোধ গড়তে হবে। সাধারণ নাগরিকরা মিলে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের সামাজিকভাবে বয়কট করবেন। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রামিসা হত্যার আসামিদের আইনের আওতায় না আনলে এবং চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলে নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
















