গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণায় সারা দেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এই আলোচনার মধ্যেই সরকার নিজেদের অবস্থান একেবারে পরিষ্কার করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কথা বলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, সরকার শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত আনতে চায়। দেশে ফিরে তিনি যেন তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর মুখোমুখি হন, সেটাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এরপর কয়েকটি ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি শিগগিরই দেশে ফেরার কথা জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিদ্যমান বন্দী প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশন চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে অনেক সময় প্রচুর অর্থ খরচ হয়, যা হাজার হাজার ডলার ($) ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সরকার আইনি পথেই হাঁটতে বদ্ধপরিকর। যদিও ভারত সরকার এখনো এই অনুরোধের কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি।
ভারতের রাজনীতি ও বিতর্কিত আইন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা সিএএ নিয়ে তিনি কথা বলেন। তিনি বলেন, সিএএ বা আসামের এনআরসি সম্পূর্ণভাবে ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাদের দেশের নাগরিকদের জন্য তারা নিজস্ব আইন তৈরি করবে, সেখানে বাংলাদেশের মন্তব্য করার কোনো সুযোগ নেই। তবে আমরা আমাদের সীমান্ত নিয়ে ১০০% সতর্ক আছি। কোনোভাবেই যেন ভারত থেকে অবৈধভাবে কেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বা পুশ ইন করতে না পারে, সে জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জঘন্য অপরাধের বিচার নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের এক অবুঝ শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার নির্মম ঘটনার কথা তিনি উল্লেখ করেন। মন্ত্রী জানান, এই ঘটনার পরপরই পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করেছে। ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামি সোহেল ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। মূল আসামি ইতিমধ্যে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ সম্ভাব্য সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট জমা দেবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ এভাবেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে পুলিশ এখন দুটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পুলিশ এখন প্রো-অ্যাক্টিভ বা প্রতিরোধমূলক এবং রি-অ্যাক্টিভ বা প্রতিক্রিয়াশীল—এই দুই ধরনেই মাঠে আছে। মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মতো বড় অপরাধগুলো আগে থেকেই ঠেকাতে পুলিশ প্রো-অ্যাক্টিভ অভিযান চালাচ্ছে। মাদকের মতো মিলিয়ন ডলার ($) অবৈধ বাণিজ্য ধ্বংস করতে এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা খুব জরুরি। অন্যদিকে হত্যা বা ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটলে রি-অ্যাক্টিভ ব্যবস্থায় পুলিশ দ্রুত আসামিদের ধরছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীর মোহাম্মদপুর, শেরেবাংলা নগর ও আদাবর এলাকায় নিশ্ছিদ্র তল্লাশি ও ব্লক রেইড পরিচালনা করছে। এর ফলে এসব এলাকায় অপরাধের মাত্রা প্রায় ৪০% কমে গেছে।
ব্লক রেইডের পাশাপাশি পুলিশ নির্দিষ্ট সন্ত্রাসীদের ধরতেও চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে। গত ১৮ ও ১৯ মে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও তেজগাঁও থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে পুলিশ যথাক্রমে ৪১ জন এবং ৬৩ জন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ও ভয়ংকর ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। শুধু রাজধানী নয়, চট্টগ্রাম ও উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলেও র্যাব-১৫ বিশেষ অভিযান চালিয়ে দীর্ঘদিনের পলাতক অপরাধীদের ধরছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোও নতুন করে সচল করেছে। এর মধ্যে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু হত্যা মামলা অন্যতম। এ ছাড়া কুমিল্লায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, বগুড়ায় তরুণী ধর্ষণ, কাপাসিয়ায় পাঁচ খুন এবং ঢাকার মান্ডায় প্রবাসী হত্যাকাণ্ডের মতো প্রতিটি বড় ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে পুলিশ ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে।
আইন সংস্কারের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উত্তর দেন। তিনি বলেন, আইন সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সরকার সব আইনকে অবশ্যই যুগোপযোগী করবে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, মানুষের সাময়িক ক্ষোভ মেটাতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে চটজলদি কোনো আইন বানানো বা বিশেষ আদালত গঠন করা মোটেও ঠিক কাজ নয়। দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন কারও প্রতি অবিচার না হয় বা কঠোর আইনের কোনো অপব্যবহার না হয়, সেদিকে সরকারকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পুলিশকে কাজ করার কঠোর নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী তাঁর ব্রিফিং শেষ করেন।
















