রাশিয়ার বিরুদ্ধে খেলার ‘তাস’ ফুরিয়ে গেছে জেলেনস্কির

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় তৈরি করেছে, যা শুরু হয়েছিল তীব্র উত্তেজনা দিয়ে, কিন্তু এখন তা পরিণত হয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিতে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সারা বিশ্বের কাছে এক বীরের মর্যাদায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। সবুজ রঙের টি-শার্ট গায়ে দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর পার্লামেন্টে তার জ্বালাময়ী ভাষণ আর দেশের মাটি ছেড়ে না যাওয়ার জেদ তাকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। পশ্চিমাদের বিপুল সামরিক ও আর্থিক সহায়তায় ইউক্রেন বেশ শক্ত হাতেই পরাশক্তি রাশিয়ার মোকাবিলা করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের বয়স যত বেড়েছে, পরিস্থিতি ততই জটিল ও কঠিন হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং পশ্চিমা মিত্রদের অনীহা মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন— রাশিয়ার বিরুদ্ধে খেলার মতো জেলেনস্কির হাতে আর তেমন কোনো জাদুকরী ‘তাস’ বা কৌশল অবশিষ্ট নেই।

পশ্চিমা সহায়তায় ভাটা ও মিত্রদের ক্লান্তি

যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো যেভাবে উন্মুক্ত হস্তে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছিল, এখন সেই উৎসাহে বেশ বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। মাসের পর মাস বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিতে গিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর নিজেদের অর্থনীতিতেও চাপ পড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ওইসব দেশের সাধারণ করদাতারা ইউক্রেনকে অন্ধভাবে সমর্থন করার বিপক্ষে আওয়াজ তুলছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের কারণে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি এখন আগের মতো মোটেও সহজ নেই। ইউরোপের অনেক দেশও এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বেশি চিন্তিত। জেলেনস্কির সবচেয়ে বড় তাস ছিল পশ্চিমাদের অবারিত সমর্থন, যা এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

ব্যর্থ পাল্টা আক্রমণ ও রণক্ষেত্রের স্থবিরতা

গত বছর ইউক্রেনের বহু প্রতীক্ষিত ‘কাউন্টার অফেনসিভ’ বা পাল্টা আক্রমণের দিকে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে ছিল। পশ্চিমা আধুনিক ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও ইউক্রেন রাশিয়ার শক্তিশালী ও সুপরিকল্পিত প্রতিরোধ ব্যূহ ভাঙতে পারেনি। উল্টো রাশিয়া এখন পূর্ব ইউক্রেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে, যেমন আভদিভকা বা বাখমুতের মতো এলাকায় নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে এবং কিছু এলাকা নিজেদের দখলে নিয়েছে। রণক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো সামরিক সাফল্য দেখাতে না পারায় জেলেনস্কির পক্ষে মিত্রদের কাছ থেকে নতুন করে বিশাল অঙ্কের সহায়তা আদায় করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সামরিক দিক থেকে নতুন কোনো চমক দেখানোর সুযোগ ইউক্রেনের হাতে এই মুহূর্তে নেই বললেই চলে।

অস্ত্র ও গোলাবারুদের তীব্র সংকট

আধুনিক যুদ্ধ শুধু সাহসের ওপর নির্ভর করে জেতা যায় না, এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন অস্ত্র ও গোলাবারুদ। বর্তমানে রণক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনী চরম গোলাবারুদ সংকটে ভুগছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইউক্রেনীয় বাহিনী দিনে যতগুলো কামানের গোলা ফায়ার করছে, রাশিয়ার বাহিনী তার চেয়ে পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি গোলা নিক্ষেপ করছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও ইউক্রেন পিছিয়ে পড়ছে, যার ফলে রাশিয়ার মিসাইল ও ড্রোন হামলা ঠেকানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিশ্রুত এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বা অন্যান্য ভারী অস্ত্র আসতে যে পরিমাণ দেরি হয়েছে, তাতে রণক্ষেত্রের সমীকরণ ততদিনে রাশিয়ার অনুকূলে চলে গেছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

জনবল সংকট ও অভ্যন্তরীণ হতাশা

যেকোনো যুদ্ধ জেতার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুপ্রাণিত ও দক্ষ সেনা সদস্য। কিন্তু দীর্ঘ এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইউক্রেন তার বহু অভিজ্ঞ সৈন্য হারিয়েছে। যারা এখনো ফ্রন্টলাইনে আছেন, তারা চরম ক্লান্ত। নতুন করে সেনা নিয়োগ বা মবিলাইজেশন করতে গিয়ে জেলেনস্কি সরকারকে দেশের ভেতরেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। সাধারণ ইউক্রেনীয়রা যুদ্ধের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। দিনের পর দিন বিদ্যুৎহীন থাকা, মৃত্যুর ভয় আর স্বজন হারানোর বেদনা মানুষকে ক্লান্ত করে তুলেছে। অনেক তরুণ দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। দেশের ভেতরের এই নীরব হতাশা জেলেনস্কির জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে মনোযোগের পরিবর্তন

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মনোযোগ খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়, আর এটাই স্বাভাবিক। মধ্যপ্রাচ্যে গাজা ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত শুরু হওয়ার পর পুরো বিশ্বের মিডিয়া, জাতিসংঘ ও পরাশক্তিগুলোর মনোযোগ ইউক্রেন থেকে সরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের নজর এখন মধ্যপ্রাচ্য সামলানো এবং নিজেদের আসন্ন নির্বাচনের দিকে বেশি। বিশ্বমঞ্চে ইউক্রেন ইস্যুটি এখন আর এক নম্বর অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। জেলেনস্কি আগে যেমন খুব সহজেই বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করে সহানুভূতি ও সহায়তা আদায় করতে পারতেন, সেই শক্তিশালী কূটনৈতিক তাসটি এখন একেবারেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক ঘুরে দাঁড়ানো

পশ্চিমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি হুড়মুড় করে ধসে পড়বে এবং ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ থামাতে বাধ্য হবেন। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাশিয়া চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কাছে বিকল্প উপায়ে জ্বালানি বিক্রি করে নিজেদের অর্থনীতি সচল রেখেছে। শুধু তাই নয়, তারা নিজেদের সমরাস্ত্র কারখানায় উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা সেখানে অস্ত্র তৈরি হচ্ছে। পশ্চিমা স্যাংশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুতিন প্রমাণ করেছেন যে, দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য রাশিয়া শুধু প্রস্তুতই নয়, বরং তারা অর্থনীতিকে যুদ্ধের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। এই ঘুরে দাঁড়ানো জেলেনস্কির হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

শান্তি আলোচনার অদৃশ্য চাপ

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর ভেতরে এখন এক ধরনের নীরব উপলব্ধি কাজ করছে যে, এই যুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে হয়তো সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করে রাশিয়াকে বিতাড়িত করা সম্ভব নয়। তাই পর্দার আড়ালে থেকে জেলেনস্কির ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করা হচ্ছে, যেন তিনি রাশিয়ার সাথে কোনো একটি আপস-মীমাংসায় পৌঁছান। এমনকি প্রয়োজনে কিছু ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিয়ে হলেও যুদ্ধ থামানোর গুঞ্জন আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো হচ্ছে। কিন্তু জেলেনস্কির জন্য এমন কোনো চুক্তি মেনে নেওয়া মানে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি এবং দেশের মানুষের কাছে হার মানা। তারপরও পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাকে ধীরে ধীরে সেই খাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ভলোদিমির জেলেনস্কি তার দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে অসীম সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ ময়দানে শুধু আবেগ আর সাহস দিয়ে বড় পরাশক্তির বিরুদ্ধে অনন্তকাল যুদ্ধ জেতা যায় না। পশ্চিমাদের প্রতিশ্রুতির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এবং রাশিয়ার টিকে থাকার ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করার চরম মূল্য এখন ইউক্রেনকে চোকাতে হচ্ছে। রণক্ষেত্রের স্থবিরতা, মিত্রদের ক্লান্তি, অস্ত্রের অভাব আর বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ—সব মিলিয়ে রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো কোনো জাদুকরী তাসই আর জেলেনস্কির হাতে নেই। আগামী দিনগুলোতে হয়তো তাকে এমন কিছু কঠিন ও তেতো আপসের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা তিনি যুদ্ধের শুরুতে স্বপ্নেও কল্পনা করেননি। ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে এই রূঢ় বাস্তবতাকে তারা কতটা দ্রুত ও বুদ্ধিমত্তার সাথে মেনে নিতে পারে তার ওপর।


ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ